রবিবার, জুন ২৮, ২০২৬
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ

উগান্ডায় সেনাপ্রধানের নির্দেশে দেশের শীর্ষ দুই মিডিয়া হাউস বন্ধ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬, ০৬:১১ পিএম

উগান্ডায় সেনাপ্রধানের নির্দেশে দেশের শীর্ষ দুই মিডিয়া হাউস বন্ধ
ছবি : Collected

পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর এক নজিরবিহীন আঘাত নেমে এসেছে। দেশটির সেনাপ্রধান মুহুজি কেইনেরুগাবা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে উগান্ডার সবচেয়ে বড় দুটি মিডিয়া হাউস বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন।

 

রোববার (২৮ জুন) জারি করা এক কঠোর আদেশের মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, ‘ডেইলি মনিটর’ পত্রিকা এবং ‘এনটিভি উগান্ডা’র সব কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। সেনাপ্রধানের স্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী, তার পূর্বানুমতি ছাড়া এই মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় খোলার কোনো সুযোগ নেই।

 

এই নির্দেশনার পরপরই উগান্ডার সামরিক বাহিনীর সদস্যরা রাজধানী কাম্পালা এবং এর আশপাশের সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে অবস্থান নিয়ে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। সেনাপ্রধান মুহুজি কেইনেরুগাবা, যিনি উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইওয়েরি মুসেভেনির ছেলে এবং বর্তমানে দেশটির ডি-ফ্যাক্টো শাসক হিসেবে পরিচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ নিজের এমন স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

 

তিনি খোলাখুলিভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি উগান্ডায় স্বাধীন গণমাধ্যমের ধারণায় বিশ্বাসী নন। সেনাপ্রধানের ভাষ্যমতে, উগান্ডা সম্পর্কে প্রকাশিত সব নেতিবাচক খবর এখন থেকে সরাসরি সামরিক বাহিনীর দপ্তরের ছাড়পত্র বা অনুমোদনের পরই কেবল প্রকাশিত হতে পারবে।

 

তার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে উগান্ডার সকল মিডিয়া প্রতিষ্ঠানকে কঠোরভাবে সেনাবাহিনীর বেঁধে দেওয়া আইন মেনে চলতে হবে। এই নির্দেশনার মাধ্যমে উগান্ডায় সাংবাদিকতার স্বাধীনতার যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও কার্যত বিলুপ্ত হয়ে পড়ল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

 

উগান্ডার ডেইলি মনিটর দেশটির সবচেয়ে বড় এবং প্রভাবশালী স্বাধীন পত্রিকা হিসেবে পরিচিত। একইভাবে এনটিভি উগান্ডা দেশটির বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচারের ক্ষেত্রে একটি অগ্রগণ্য নাম। এই মিডিয়া প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানা রয়েছে ন্যাশনাল মিডিয়া গ্রুপের কাছে, যা উগান্ডার অন্যতম বৃহৎ একটি বাণিজ্যগোষ্ঠী।

 

ডেইলি মনিটর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, গত রোববার থেকেই রাজধানী কাম্পালার নামুওয়াঙ্গো এবং সেরেনা হোটেল এলাকার অফিসে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে অফিসগুলোতে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রবেশ বা বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, যা এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

 

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল মিডিয়া গ্রুপের আওতাধীন অন্যান্য সহযোগী চ্যানেল যেমন-স্পার্ক টিভি এবং বিভিন্ন রেডিও স্টেশনের সম্প্রচারও রোববার থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর এই ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ উগান্ডার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।

 

সেনাপ্রধান মুহুজি কেইনেরুগাবার সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ কেবল একটি দেশের সংবাদমাধ্যমকে স্তব্ধ করে দেয়নি, বরং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

সামরিক বাহিনী কর্তৃক মিডিয়া হাউস দখলের ঘটনায় সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে। সেনাপ্রধানের এই একতরফা সিদ্ধান্তে উগান্ডার অভ্যন্তরীণ সংবাদ প্রবাহের ওপর সেন্সরশিপ আরও কঠোর হবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, উগান্ডার রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত কালো অধ্যায়। প্রেসিডেন্টের ছেলের হাতে এমন সীমাহীন ক্ষমতা এবং গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘটনা উগান্ডার শাসনব্যবস্থায় একনায়কতন্ত্রের স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়।

 

দেশটির সেনাবাহিনী বর্তমানে যে ধরনের সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবে সেনাপ্রধানের সাম্প্রতিক এই কঠোর অবস্থানের পর উগান্ডার স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো এখন এক অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে।

 

ভবিষ্যতে উগান্ডার মিডিয়া হাউসগুলো তাদের পেশাদারিত্ব বজায় রেখে সংবাদ পরিবেশন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধের এই ধারা উগান্ডার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

 

- আল জাজিরা