এরপর থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়াতে থাকা এই মহামারিতে এখন পর্যন্ত ইবোলা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজার দুই শ তিনজনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে মারাত্মক এই ভাইরাসের ছোবলে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিন শ একুশজন দুর্ভাগা নাগরিক।
শুক্রবার গভীর রাতে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ পরিস্থিতিবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই মর্মান্তিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, নতুন করে প্রতিনিয়ত আরও মানুষের সংক্রমিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা দেশটির ইতিমধ্যে পর্যুদস্ত ও ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য এক অভাবনীয় বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, চিকিৎসার মাধ্যমে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে এখন পর্যন্ত এক শ আটচল্লিশজন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন, যা চিকিৎসাকর্মীদের জন্য সামান্য আশার আলো বয়ে এনেছে।
অন্যদিকে, আরও চার শ উনিশজন রোগী বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে আইসোলেশন বা হাসপাতালের বিশেষায়িত ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন যে, বুনডিবুগিও নামক ইবোলার একটি বিশেষ ও অত্যন্ত প্রাণঘাতী ধরনের (স্ট্রেইন) মাধ্যমে বর্তমান মহামারির বিস্তার ঘটছে।
ইতিমধ্যে দেশটির তিনটি ভিন্ন প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার মোট চৌত্রিশটি স্বাস্থ্য অঞ্চলে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ইতুরি প্রদেশটি এই মহামারির মূল বা প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
এছাড়াও, নর্থ কিভু এবং সাউথ কিভু প্রদেশেও ভাইরাসের সংক্রমণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। মহামারির এই ভয়াবহ বিস্তার রোধ ও সংক্রমণ মোকাবিলার ক্ষেত্রে চিকিৎসাকর্মী এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত বেশ কিছু গুরুতর ও জটিল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।
এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো মৃতদেহ পরীক্ষার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রবল বাধা ও অসহযোগিতা। স্বাস্থ্য প্রটোকল না মেনে সনাতন পদ্ধতিতে মৃতদেহ সৎকারের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
একই সঙ্গে, মহামারির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত ইতুরি প্রদেশে ক্রমবর্ধমান রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকেন্দ্র, সরঞ্জাম ও ধারণক্ষমতার চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এর পাশাপাশি, ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজন রোগীদের খুঁজে বের করার হার বা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার (পঁচানব্বই শতাংশ) চেয়ে অনেক নিচে অবস্থান করছে। এই অসম্পূর্ণ নজরদারি পদ্ধতি ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উদ্ভূত এই জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট ও ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গণতান্ত্রিক কঙ্গো সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকদের প্রতি বিশেষ, কঠোর ও জরুরি নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ইবোলার বিরুদ্ধে এই লড়াই কেবল সরকার বা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
মহামারি থেকে বাঁচতে প্রতিটি নাগরিককে সর্বোচ্চ ও অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিজ এলাকায় যেকোনো সন্দেহভাজন ইবোলা রোগীর খোঁজ পাওয়া মাত্রই তা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
এছাড়াও, সবাইকে কঠোরভাবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা মেনে চলতে বলা হয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই মৃত ব্যক্তির লাশ খালি হাতে স্পর্শ করা বা আলিঙ্গন করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য কড়া নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
এই জাতীয় সংকটে কঙ্গো সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) মহাপরিচালক জিন কাসেয়া গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল এবং ফরাসি ও কঙ্গোলিজ কর্তৃপক্ষসহ সকল আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা এই প্রাণঘাতী মহামারি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তারা একটি সমন্বিত, কার্যকর ও সর্বাত্মক যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব রোধ করতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
এ দিকে, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম ঘেব্রেয়াসুস সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মহামারি নিয়ন্ত্রণের ভয়াবহতার দিকটি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে চলমান সশস্ত্র যুদ্ধ ও সংঘাত ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াইকে বহুগুণ কঠিন ও দুঃসাধ্য করে তুলছে। সংঘাতের কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা ও চিকিৎসা সরঞ্জামবাহী যান অনেক অবরুদ্ধ অঞ্চলে প্রবেশ করতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
এর ফলে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছেন। অপরদিকে, সাধারণ মানুষ একদিকে সশস্ত্র বাহিনীর ভয় এবং অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি অবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে আত্মগোপন করছেন, যা এই প্রাণঘাতী মহামারির বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করে এক মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।