বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে কলেরার নতুন ঢেউ, মৃত্যু ১২০ জনের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে কলেরার নতুন ঢেউ, মৃত্যু ১২০ জনের
ছবি : Collected

আফ্রিকার দেশ সুদানে গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ দেশটিকে এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। চলমান এই সংঘাতের ভয়াবহতার মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছে কলেরার প্রাদুর্ভাব।

 

বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া এই নতুন প্রাদুর্ভাবে সুদানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধকবলিত বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ১০২ জন মানুষ এই প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

সুদান বর্তমানে কেবল সামরিক সংঘাতের কারণেই নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় এক নজিরবিহীন জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে দেশটির সামগ্রিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

 

গত মার্চ মাসে কলেরার পূর্ববর্তী প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় দেশজুড়ে তিন বছরের মধ্যে সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ শুরু হলো। সরকারি হিসাবমতে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত কলেরার পূর্ববর্তী প্রকোপে দেশটিতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।

 

উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার এই দেশটিতে সাধারণত প্রতি তিন বছর অন্তর কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়, যা একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে বর্তমানে সংঘাতের তীব্রতা, যাতায়াতের চরম প্রতিবন্ধকতা এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র সংকটের কারণে সুদানকে প্রায় বিরতিহীনভাবে এই প্রাণঘাতী রোগের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুদান প্রধান ড. শিবলি সাহবানি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুদানে বর্ষা মৌসুম আরও তীব্র হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। সাধারণত বর্ষাকালে লাখ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সংক্রমণের বিস্তার ব্যাপক আকার ধারণ করে।

 

দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে পশ্চিম কার্দোফান রাজ্যে এই প্রাদুর্ভাব নতুন করে আঘাত হেনেছে। এলাকাটি বর্তমানে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণ রেখার বিভাজন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

উভয় পক্ষের ক্রমবর্ধমান প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় বাণিজ্যিক ও দাতব্য সংস্থার যাতায়াত পথগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যার ফলে সেখানে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন।

 

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে যে, প্রতিবেশী উত্তর কার্দোফান রাজ্যেও প্রায় ৩০০ জন সন্দেহভাজন আক্রান্ত এবং তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে যে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

 

ওই রাজ্যের রাজধানী আল-উবাইদে আরএসএফ বাহিনীর বড় ধরনের স্থল অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণের খবরে জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক প্রধান টম ফ্লেচার মঙ্গলবার এক সতর্কবার্তায় জানান, শহরের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে অব্যাহত ড্রোন হামলার ফলে সুপেয় পানির সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ পরিষেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

 

এর ফলে জনবসতিতে ব্যাপক নৃশংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের গত তিন বছরে দেশটিতে দুই লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা জানিয়েছে। সংঘাতের ফলে সুদানের স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।

 

ড. সাহবানি জানিয়েছেন, দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ৪০ শতাংশ একেবারেই অকেজো হয়ে পড়েছে এবং অবশিষ্ট ৬০ শতাংশ কেন্দ্র আংশিকভাবে সচল থাকলেও সেখানে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা বা ওষুধ সরবরাহের সক্ষমতা নেই।

 

যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কর্মকাণ্ডের ফলে জীবন রক্ষাকারী সেবা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে, যা সুদানের ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। কলেরার এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক করিডোর উন্মুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই, নতুবা দেশটিতে মৃতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

 

- এএফপি