বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলোতে পানিবন্দি ও আটকাপড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে আনতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। তবে পানির প্রবল স্রোত এবং দুর্গম পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, স্রোতের তোড়ে ভেসে গিয়ে এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে আগামী দিনগুলোতে নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণহানির এই সংখ্যা আরও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ এই বন্যায় পুরো ঘানাজুড়ে এক চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ঘানার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার (ন্যাডমো) পরিদর্শন বিভাগের পরিচালক রিচার্ড অ্যামো ইয়ার্টে এই ভয়াবহ দুর্যোগের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরেছেন।
গত বৃহস্পতিবার একটি স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন যে, দেশব্যাপী তল্লাশি চালিয়ে এখন পর্যন্ত ৩৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে কেবল রাজধানী আক্রাতেই বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় সেখানে অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানান, নিখোঁজ থাকা বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ এখনও চলমান রয়েছে। বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধারকর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি আরও মৃতদেহ উদ্ধার হয়, তবে নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই আরও দীর্ঘ হবে।
নিখোঁজদের সন্ধানে এবং অবরুদ্ধ মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা দিনরাত নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ন্যাডমোর সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভয়াবহ এই বন্যায় ঘানার মোট সাতটি অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশজুড়ে সর্বমোট ৮৯ হাজার ৭৩৬ জন মানুষ নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতির মাত্রার দিক থেকে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে দেশটির গ্রেটার আক্রা অঞ্চল। কেবল এই একটি অঞ্চলেই ৫৪ হাজার ৭১২ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন।
বিপর্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সেন্ট্রাল অঞ্চল, যেখানে অন্তত ২১ হাজার ৮৮২ জন বাসিন্দা বন্যার প্রবল তোড়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি ভোল্টা, ওয়েস্টার্ন, আশান্তি, ওয়েস্টার্ন নর্থ এবং ইস্টার্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষও আকস্মিক এই বন্যার ভয়াল থাবায় পতিত হয়েছেন।
যদিও তুলনামূলকভাবে ইস্টার্ন অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কম বলে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, তবুও সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক ও সংকটময় বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বন্যার এই নির্মম ধ্বংসলীলায় কেবল মানুষের জীবন ও বাসস্থানই বিপন্ন হয়নি, বরং দেশটির সার্বিক অবকাঠামো ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত কৃষিখাতেও নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। বিস্তীর্ণ এলাকার পর এলাকা ঢলের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অসংখ্য কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।
প্রধান প্রধান সড়ক ও সেতুগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বা স্রোতে ভেসে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে, যা দুর্গত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সরবরাহ ও উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া হাজার হাজার হেক্টর আবাদি ও ফসলি জমি বন্যার পানিতে দীর্ঘ সময় ধরে তলিয়ে থাকায় কৃষকদের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি ভবিষ্যতে দেশটিতে চরম খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি করছে।
গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত মানুষদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং তাদের মুখে আহার তুলে দেওয়া এখন ঘানা সরকারের সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের এই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং মুহূর্তে স্থানীয় প্রশাসন, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে জোরদার ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
অস্থায়ীভাবে স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সরবরাহের কাজ চলছে। তবে দুর্গত মানুষের সংখ্যার তুলনায় ত্রাণের পরিমাণ অপ্রতুল হওয়ায় অনেক এলাকাতেই তীব্র হাহাকার ও হতাশা বিরাজ করছে।
ঘানার সরকার এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় নিজেদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে। প্রকৃতির এই ভয়াল রুদ্ররোষ থেকে ঘানার সাধারণ মানুষের জনজীবন কবে নাগাদ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হচ্ছে না।