আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন এবং সুদানের সামরিক দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাতে মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সামরিক বিজয় সুদানের দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের গতিপ্রকৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সুদানের রাজধানী খার্তুম এবং ইস্তাম্বুল থেকে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোরের দিকে সুদানের সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে এই সফল সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ফাশফুন অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করতে তাদের চতুর্থ পদাতিক ডিভিশনের ত্রয়োদশ ব্রিগেডের সদস্যরা এক সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন।
এই বিশেষ অভিযানে তাদের সম্মুখভাগ থেকে সক্রিয়ভাবে ব্যাকআপ ও সহযোগিতা প্রদান করে সুদানের চৌকস বিশেষ অভিযান দল বা স্পেশাল অপারেশনস ইউনিটস। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই চূড়ান্ত ও নিষ্পত্তিমূলক লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য হতাহত হয়েছে এবং তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে বলে সেনাবাহিনী দাবি করেছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফাশফুন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সরকারি বাহিনী সেখানে তাদের সামরিক আধিপত্য বজায় রেখেছে। বর্তমানে ওই অঞ্চলে আরএসএফ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অবশিষ্টাংশদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের পুরোপুরি নির্মূল করতে ব্যাপক তল্লাশি ও নিরাপত্তামূলক অভিযান চালানো হচ্ছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ওই অঞ্চলের সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘদিনের অস্থিতিশীলতা দূর করে টেকসই স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এখন সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য। সামরিক কমান্ডাররা জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে সম্পূর্ণ শান্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত তাদের এই চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ফাশফুন অঞ্চল দখলের এই বড় ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এল, যার মাত্র কয়েক দিন আগেই তারা একই রাজ্যের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছিল।
গত ৮ জুলাই সুদানের সেনাবাহিনী দক্ষিণ সুদান সীমান্তের কাছে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শহর আল-কুরমুক পুনর্দখল করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই দুটি বড় সাফল্য ব্লু নাইল রাজ্যে সুদানের সরকারি বাহিনীর অবস্থানকে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসংহত করেছে বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান প্রতিবেশী দেশের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সুদানের ব্লু নাইল রাজ্যটি দীর্ঘ সময় ধরেই এক অশান্ত ও সংঘাতময় এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের একটি বিশাল অংশ দীর্ঘদিন ধরে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ২০১১ সাল থেকেই সুদান পিপলস লিবারেশন মুভমেন্ট-নর্থ বা এসপিএলএম-এন নামক সশস্ত্র গোষ্ঠীটি তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছিল।
তাদের মূল রাজনৈতিক ও সামরিক দাবি হলো সুদানের দক্ষিণ কর্দোফান এবং ব্লু নাইল অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জন করা। ফলে এই অঞ্চলে আরএসএফের পাশাপাশি এই আদিবাসী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উপস্থিতি সুদান সরকারের জন্য সব সময়ই একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করেছে, যা সাম্প্রতিক এই অভিযানের মাধ্যমে অনেকটাই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে সমগ্র সুদান এক ভয়াবহ ও বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। তৎকালীন সময়ে সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং দেশের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন এবং আধাসামরিক বাহিনীকে নিয়মিত সামরিক বাহিনীর মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল।
দুই পক্ষের শীর্ষ নেতৃত্বের অহংবোধ এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাই মূলত এই যুদ্ধকে পুরো দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিকৃষ্ট ও ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে এ পর্যন্ত হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে অভ্যন্তরীণভাবে ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও, রণক্ষেত্রের এই সাম্প্রতিক জয়-পরাজয়ের সমীকরণ সুদানের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে আরও দীর্ঘ ও জটিল করে তুলছে।