বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলজেরিয়ার এতিমখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, অন্তত ১১ জনের প্রাণহানি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম

আলজেরিয়ার এতিমখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, অন্তত ১১ জনের প্রাণহানি
ছবি : Collected

উত্তর আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র আলজেরিয়ায় এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির রাজধানী আলজিয়ার্সের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি এতিমখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অন্তত ১১ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।

 

এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক অগ্নিকাণ্ডে আরও অন্তত ১৯ জন মাঝারি ও গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে আলজেরিয়ার ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ও জরুরি দুর্যোগ মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন এতিমখানার বেশিরভাগ অসহায় বাসিন্দা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়, যা মুহূর্তের মধ্যেই ভয়াল রূপ ধারণ করে পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।

 

দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম এবং স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী আলজিয়ার্সের পূর্বাঞ্চলীয় শহরতলী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদিয়া জেলার একটি বহুতল এতিমখানায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

 

এমন একটি স্থানে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে যেখানে সমাজের সবচেয়ে অসহায়, অভিভাবকহীন ও সুরক্ষাহীন শিশু এবং ব্যক্তিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই বিষয়টি সমগ্র ঘটনাটিকে আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল, উদ্বেগজনক এবং বেদনদায়ক করে তুলেছে।

 

ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ, জরুরি উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিসের অসংখ্য কর্মী দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করেন।

 

তাদের এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপের কারণে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হলেও, দুর্ভাগ্যবশত ১১টি অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যাওয়া কোনোভাবেই রোধ করা যায়নি।

 

সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিবরণ ও উদ্ধারকারী দলের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, নিহত ১১ জনের সঠিক বয়স বা পরিচয় সুরক্ষার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

 

তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই হতাহতদের মধ্যে অনেকেই অল্পবয়সী হতে পারে। অন্যদিকে, আহত যে ১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

 

তারা আগুনে মাঝারি থেকে অত্যন্ত গুরুতর মাত্রায় দগ্ধ হয়েছেন এবং ধোঁয়ায় তাদের শ্বাসযন্ত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তাদের রাজধানী আলজিয়ার্সের বিভিন্ন আধুনিক হাসপাতালের দগ্ধ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (বার্ন ইউনিট) রেখে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।

 

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও উদ্ধারকারী দলের সাহসিকতা ও ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে একটি ইতিবাচক দিক হলো, তারা এতিমখানায় অবস্থানরত অন্তত পাঁচজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

 

অগ্নিনির্বাপণ ও তল্লাশি কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে। ঠিক কী কারণে এমন সুরক্ষিত একটি স্থানে আগুন লাগল, সেটির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষজ্ঞ দল আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করার পাশাপাশি এর উৎপত্তিস্থল ও প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি বিশদ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বৈদ্যুতিক গোলযোগ, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত, নাকি অন্য কোনো মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা-সবগুলো দিকই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

তবে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগে এবং ফরেনসিক তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস বিভাগ।

 

তারা জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের ফলে পুরো ভবনটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং ভেতরে কাঠামোগত শীতলীকরণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি এমন এক চরম সংকটময় সময়ে ঘটল, যখন পুরো আলজেরিয়া এবং উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এক নজিরবিহীন ও তীব্র দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে।

 

আবহাওয়াগত চরম বৈরী পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে এমনিতেই শুষ্কতার মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং বিভিন্ন স্থানে দাবানল ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। আলজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএস-এর দেওয়া সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গত ৮ জুলাই থেকে সারা দেশে সব মিলিয়ে ৯১৩টি ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

 

এসব আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের দিনরাত আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট এই চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার মাঝেই এতিমখানায় ঘটা এই প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড আলজেরিয়ার প্রশাসন ও সাধারণ নাগরিকদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে।

 

সমাজের অভিভাবকহীন ও সবচেয়ে অসহায় মানুষদের এমন করুণ মৃত্যুতে আলজেরিয়ার সাধারণ মানুষের মাঝে শোকের গভীর ছায়া নেমে এসেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা দেশটিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা প্রোটোকল নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

- এএফপি