বেশ কিছুদিন ধরেই নাইজেরিয়ায় চালকদের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ, অস্বাভাবিক হারে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, আনুপাতিক হারে কম যাত্রীভাড়া এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোর দিক থেকে আসা তীব্র ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার চাপে কোণঠাসা অবস্থায় ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক কাঠামোগত পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই উবার কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত এই দুই দেশ থেকে নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ নাইজেরিয়ায় উবারের ব্যবসায়িক সংকট মূলত অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দেশটিতে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেলেও, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অ্যাপভিত্তিক যাত্রীভাড়া তুলনামূলকভাবে বেশ কম রাখতে বাধ্য হচ্ছিল উবার।
অন্যদিকে, চালকদের আয়ের একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে কেটে নেওয়ার কারণে চালকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়ের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উবার চালকেরা বেশ কয়েকবার রাজপথে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং কর্মবিরতিও পালন করেন।
বিশেষ করে ২০২৩ সালে নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর দেশের অর্থনীতি সংস্কারের লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের জ্বালানি ভর্তুকি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেন। সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দেশটিতে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গাড়িচালকদের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়ের ওপর।
উবারের বৈশ্বিক পরিচালনা পর্ষদ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, নাইজেরিয়া এবং উগান্ডায় তাদের কার্যক্রম বন্ধের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তটি কেবল এই নির্দিষ্ট দুটি বাজারের ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে। আফ্রিকার অন্য কোনো দেশে কোম্পানিটির চলমান ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
ওই বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, সাব-সাহারান বা সাহারা-নিম্ন আফ্রিকার বিস্তীর্ণ বাজার নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখনও অত্যন্ত আশাবাদী এবং সেখানে তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ব্যবসা চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উবারের এই প্রস্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারা খোসরুশাহি সম্প্রতি সারা বিশ্বে উবারের মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় দশ শতাংশ ছাঁটাই করার এক যুগান্তকারী ঘোষণা দিয়েছেন।
মূলত বৈশ্বিক ব্যয় সংকোচন নীতির অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতাতেই এই সিদ্ধান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, গত এক বছরের ব্যবধানে আফ্রিকার আরও দুটি দেশ আইভরি কোস্ট এবং তানজানিয়া থেকেও উবার তাদের যাবতীয় ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।
নাইজেরিয়া ও উগান্ডা ছাড়ার পর বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশে কেবল মিশর, ঘানা, কেনিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু থাকবে। নাইজেরিয়ার রাইড-শেয়ারিং বাজারে উবারের ইতিহাস প্রায় এক যুগের। ২০১৪ সালে দেশটিতে প্রথম কার্যক্রম শুরু করে তারা।
বাণিজ্যিক রাজধানী লাগোসের মতো জনবহুল শহরে তীব্র যানজটের সমস্যা মোকাবিলা করতে এবং যাত্রীদের দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা দিতে ২০১৯ সালে তারা নৌযানভিত্তিক যাত্রীসেবা পরিষেবাও চালু করেছিল।
কিন্তু গত এক দশকে নাইজেরিয়ার বাজারে বোল্ট এবং ইনড্রাইভের মতো বেশ কয়েকটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় রাইড-শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান প্রবেশ করায় প্রতিযোগিতার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে উবার ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে, ২০১৬ সালে উগান্ডায় কার্যক্রম শুরু করার পর সেখানেও তাদের একই পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে।
উগান্ডার স্থানীয় সংবাদপত্র ডেইলি মনিটরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী কাম্পালার দৈনন্দিন যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থায় উবারের এই প্রস্থান সাময়িক প্রভাব ফেললেও, ফারাস, বোল্ট এবং সেফবোদার মতো অন্যান্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো খুব দ্রুতই উবারের ফেলে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম হবে।
কার্যক্রম গোটানোর এই চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজেদের কর্মী ও চালকদের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। উবার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কার্যক্রম বন্ধের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মী এবং নিবন্ধিত চালকদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।
এই উদ্দেশ্যে নাইজেরিয়া ও উগান্ডায় কোম্পানিটির বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র আগামী ২৩শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খোলা রাখা হবে। নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট চালক ও কর্মীদের যাবতীয় বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে এবং যেকোনো ধরনের অমীমাংসিত আর্থিক বিষয় সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।