যুদ্ধের ভয়াবহতায় এক কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৪৫ লাখ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছেন।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুদানের প্রায় তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষের জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন এবং দুই কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। দেশের অর্থনীতি, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে।
সংঘাতের পাশাপাশি দেশটিতে দুর্ভিক্ষ ও কলেরার মতো প্রাণঘাতী মহামারির প্রাদুর্ভাব এই মানবিক সংকটকে এক অকল্পনীয় ও ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের একদিকে রয়েছে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বাধীন সুদানের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ)।
অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়ছে জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালোর (যিনি হেমেদতি নামেই বেশি পরিচিত) নেতৃত্বাধীন আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)। অথচ একসময় এই দুই প্রভাবশালী জেনারেল একে অপরের ঘনিষ্ট সহযোদ্ধা ছিলেন।
২০১৯ সালে টানা ত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার সামরিক ও গণ-অভ্যুত্থানে তারা যৌথভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বশিরের পতনের পর জেনারেল বুরহান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান এবং জেনারেল হেমেদতি তার ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে সামরিক শাসন জারি করলেও, এক লাখ সদস্যের আরএসএফ বাহিনীকে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে একীভূত করার প্রশ্নে উভয়ের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। বুরহান চেয়েছিলেন দুই বছরের মধ্যে এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, অন্যদিকে হেমেদতির দাবি ছিল দশ বছর।
একীভূত বাহিনীর নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়েও শুরু হয় ক্ষমতার চরম দ্বন্দ্ব। এই রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার পরিণতিতে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল সকালে রাজধানী খার্তুমের একটি সামরিক ঘাঁটিতে শুরু হওয়া সংঘর্ষ দ্রুত একটি দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নানা উদ্যোগ ও কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা সত্ত্বেও এই যুদ্ধ থামানো সম্ভব হয়নি; বরং প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে দুই পক্ষই নিত্যনতুন সমরাস্ত্র ও কৌশল নিয়ে মাঠে নামছে। প্রাথমিকভাবে এই যুদ্ধ কেবল স্থলেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা আকাশসীমাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এই সংঘাতকে আরও বেশি প্রাণঘাতী এবং অনিশ্চিত করে তুলেছে। ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহার সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রের চিরাচরিত সমীকরণই বদলে দিয়েছে। ইতিপূর্বে বর্ষাকালে বন্যা ও কাদায় ভারী অস্ত্র এবং সৈন্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমে আসত।
কিন্তু চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন আবহাওয়ার এই প্রতিকূলতাকে সহজেই পাশ কাটাতে সক্ষম। এর ফলে সংঘাত এখন সামরিক ঘাঁটির বাইরে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একেবারে গভীরে প্রবেশ করেছে।
ঘরবাড়ি, বাজার এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো এখন হরহামেশাই ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে, যার ফলে সমগ্র সুদানই যেন একটি উন্মুক্ত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে যে, বিদেশি প্রযুক্তির ড্রোনের সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে এই সংঘাত এক নতুন ও মারাত্মক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই সুদানে বিভিন্ন ড্রোন হামলায় অন্তত ৮৮০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘আফ্রিকা ডিফেন্স ফোরাম’-এর মতে, তুরস্কের সরবরাহকৃত দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম এবং সাশ্রয়ী ড্রোনগুলো এসএএফ-এর সামরিক শক্তি বহুগুণ বাড়িয়েছে।
তুরস্ক অবশ্য জানিয়েছে যে তারা কেবল সুদানের সার্বভৌমত্ব ও শান্তি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। অন্যদিকে, আরএসএফ-ও তাদের ড্রোন হামলার পরিধি বিস্তৃত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাধ্যমে তারা চীনের তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন সংগ্রহ করছে, যদিও আমিরাত সরকার এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রকাশনা ‘মিলিটারি আফ্রিকা’ জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষের হাতেই তুর্কি ড্রোন দেখা গেছে, যার ফলে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো সুনির্দিষ্ট হামলার জন্য ঠিক কারা দায়ী, তা চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সুদানের অন্যান্য অবরুদ্ধ শহরের মতো উত্তর কর্দোফান প্রদেশের রাজধানী আল-উবাইদের মানুষের জীবনেও ড্রোন এখন এক নিত্যদিনের আতঙ্ক। গত জুনে ৪২ বছর বয়সী পয়োনিষ্কাশন ট্রাকচালক আহমাদো একটি পানির স্টেশনে কাজ করার সময় আকস্মিক এক ড্রোন হামলায় তার নয় বছরের সন্তান ও দুই সহকর্মীকে হারান।
শোকাহত আহমাদো বলেন, "আমার দিনটি অন্য যেকোনো দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছিল। মাথার ওপর ড্রোন উড়ছিল, কিন্তু আমি কখনোই ভাবিনি যে আমার নিজের সন্তান বা আমি এর লক্ষ্যবস্তু হবো।"
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক নেট অ্যালেনের মতে, ড্রোনের এই অবাধ ব্যবহার সুদানের যুদ্ধক্ষেত্রকে নতুন রূপ দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের ছায়াযুদ্ধের একটি ভীতিকর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক জানিয়েছেন, কেবল জুন মাসেই আল-উবাইদ ও এর আশপাশে অন্তত ১৫টি ড্রোন হামলার ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে ৪৫ জনের বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
এছাড়া ড্রোনের অব্যাহত হামলার কারণে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি বাস্তুচ্যুতদের জন্য ৫০ টন ত্রাণসামগ্রী বহনকারী জাতিসংঘের একটি ট্রাকেও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।
সুদানে নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের কান্ট্রি ডিরেক্টর শাশ্বত সরাফ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, "আল-উবাইদের পরিবারগুলো চোখের সামনে তাদের সন্তানদের হারাচ্ছে, কেউ হাত-পা হারাচ্ছে, আবার কেউবা হারাচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি।
যারা এই নারকীয় হামলা থেকে বেঁচে ফিরছেন, তাদেরও অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে এবং যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।" ২৭ বছর বয়সী তরুণ এল সাদিকের জীবন এই যুদ্ধের নির্মমতার এক জীবন্ত দলিল। এর আগে তিনবার ড্রোন হামলার হাত থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও গত জুনে চতুর্থবারের হামলায় তিনি তার বাঁ পা হারান।
চরম আতঙ্কগ্রস্ত এল সাদিক বলেন, "ড্রোনের হামলা থেকে আপনি কোথাও লুকিয়ে বাঁচতে পারবেন না। আকাশে ড্রোনের শব্দ শুনলে আমরা কংক্রিটের ছাদের নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু এটি এত দ্রুত আঘাত হানে যে আপনি টেরই পাবেন না কখন বা কোথায় এটি পড়বে।
এখন ঘরের বাইরে যাওয়া মানেই চরম আতঙ্ক; আপনি জানেন না যে আর কখনো জীবিত ফিরে আসতে পারবেন কি না।" সাধারণ মানুষের এই তীব্র অসহায়ত্ব আর প্রতিনিয়ত মৃত্যুর আশঙ্কাই প্রমাণ করে, সামরিক শক্তির মোহ একটি রাষ্ট্রকে কীভাবে ধ্বংসের চরম সীমায় নিয়ে যেতে পারে।