মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলার ভয়াবহ বিস্তার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলার ভয়াবহ বিস্তার
ছবি : Collected

গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের কারণে দেশটিতে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে শয্যার চাহিদা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

 

পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও অন্তত এক হাজার ছয়শ ইবোলা চিকিৎসা শয্যার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। মঙ্গলবার জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়।

 

সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবের কারণে যে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হেলথ ইমার্জেন্সি প্রোগ্রামের টেকনিক্যাল অফিসার লুকা ফন্টানা জেনেভায় সাংবাদিকদের সামনে বর্তমান পরিস্থিতির একটি বিস্তারিত ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন।

 

তিনি জানান, ইবোলা মোকাবিলায় প্রাথমিক পর্যায়ে যে প্রস্তুতি ছিল, তা বর্তমান ভয়াবহতার তুলনায় অনেকটাই অপ্রতুল। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। ইতোমধ্যে দেশের ৫৯টি চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রায় এক হাজার চারশ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে।

 

প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার প্রথম দুই মাসে এই সংখ্যা ছিল মাত্র নয়শর বেশি। ফন্টানা বলেন, “আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে এটি অন্যতম দ্রুততম ইবোলা চিকিৎসা পরিকাঠামো সম্প্রসারণের ঘটনা। এমনকি পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা মোকাবিলার সময়ও এত দ্রুতগতিতে চিকিৎসা ব্যবস্থার এমন ব্যাপক সম্প্রসারণ আমি দেখিনি।”

 

এই মন্তব্য থেকেই কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং মাঠপর্যায়ে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তাতে বর্তমান এই ব্যবস্থা কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয় বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

ফন্টানার মতে, ক্রমবর্ধমান রোগীর বিপুল চাপ সামলাতে অবিলম্বে আরও এক হাজার ছয়শ শয্যার প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করা গেলে মোট শয্যার সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় তিন হাজারে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে, বুনিয়া শহরের আশেপাশের এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূরের প্রত্যন্ত ও দুর্গম গ্রামগুলো থেকেও রোগীরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছেন।

 

এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, প্রাদুর্ভাব কেবল নির্দিষ্ট কোনো শহর বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

এর মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যেন খুব সহজেই তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কাছাকাছি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগেই রোগীদের দ্রুত আইসোলেশনে নেওয়া সম্ভব হয়।

 

চিকিৎসা সক্ষমতা ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংস্থান করা। ইবোলার মতো অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতা এবং প্রটোকল মেনে চলার প্রয়োজন হয়।

 

স্বাস্থ্যকর্মীদের নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের সেবা প্রদান করতে হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ইবোলায় আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর জন্য সার্বক্ষণিক অন্তত তিনজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন।

 

সেই হিসেবে তিন হাজার শয্যার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রায় নয় হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। এই বিপুল সংখ্যক জনবল তৈরি করা, তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং সার্বিক সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিশাল ও জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

এই বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিশাল অঙ্কের আন্তর্জাতিক তহবিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমিয়ার জানিয়েছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি)-এর যৌথ ছয় মাস মেয়াদি জরুরি সাড়াদান পরিকল্পনার অধীনে তাদের ১১ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন।

 

এর মধ্যে তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ১১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের তহবিল বা প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। ফলে এখনও প্রায় ২৬ লাখ ডলারের একটি ঘাটতি রয়ে গেছে। তবে তিনি জোরালোভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, প্রাদুর্ভাবের মাত্রা এবং ভৌগোলিক বিস্তৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তহবিলের এই চাহিদাও আগামী দিনগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

 

এর পাশাপাশি, কঙ্গো সরকারের নিজস্ব এবং সমস্ত উন্নয়ন সহযোগী ও অংশীদারদের নিয়ে তৈরি করা আরও একটি বিস্তৃত ছয় মাস মেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা রয়েছে। ওই বৃহত্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মোট ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

এই বিশাল অর্থের সংস্থান করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নত দেশগুলোকে তাদের অনুদান দ্রুত বৃদ্ধি ও ত্বরান্বিত করার জন্য অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই অত্যন্ত নির্মমভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৬,৬৮৬ জন ইবোলা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

 

এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ৩,২২৬ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ক্রমবর্ধমান এবং মর্মান্তিক পরিসংখ্যান গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই বিশ্ব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে এই মহামারি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি