ধারাবাহিক এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশটিতে নারী নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের চলমান সামাজিক সংকট নতুন করে এক ভয়াবহ রূপ নিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে। সর্বশেষ যে হতভাগ্য নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, তার নাম দিনেও মোটাপানে।
৩৮ বছর বয়সী এবং দুই সন্তানের জননী এই নারীকে গত রোববার সর্বশেষ জীবিত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীতে এখুরুলেনির একটি আবাসিক এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নিহতের শরীরে অমানুষিক নির্যাতনের অত্যন্ত স্পষ্ট চিহ্ন ছিল এবং লাশটির বেশ কিছু অংশ আগুনে পোড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়। দিনেওর লাশ আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করার পর তার ভাগনি নকওয়ান্ডা মাতশিকিজা কান্নাজড়িত কণ্ঠে সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজেদের চরম অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তারা এখন কী করবেন বা কোথায় যাবেন, সে সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নেই, তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির একটি যৌক্তিক পরিবর্তন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি প্রশাসন ও সমাজের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, আর কতগুলো লাশ পাওয়া গেলে নারীদের সুরক্ষায় কার্যকর কিছু করা হবে?
একটি অবুঝ শিশুকে কীভাবে বোঝানো সম্ভব যে তার অভিভাবককে নির্মমভাবে হত্যা করে একটি মাঠে আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে তিনি গভীর হতাশা ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। তাঁর মতে, এমন অমানবিক ঘটনা মেনে নেওয়া বা এমন বিভীষিকা থেকে কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই নির্মম ঘটনার আগে ওই একই এলাকা থেকে আরও কয়েকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়, যা পুরো জনপদকে গভীরভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় অধিকারকর্মীরা নিশ্চিত করেছেন যে, জুলাই মাস থেকে এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৯টি লাশের মধ্যে পাঁচটিই পাওয়া গেছে এখুরুলেনির কেম্পটন পার্ক এলাকায়।
নিহতদের মধ্যে ৩২ বছর বয়সী দোকানকর্মী ইতুমেলেং রয়েছেন, যাঁকে সর্বশেষ জীবিত দেখার ১৭ দিন পর জুলাই মাসে একটি সেতুর ওপর থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় ওই নারীর শরীরে আংশিক পোশাক ছিল এবং তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল।
ইতুমেলেংয়ের ভাই থেম্বা কেকানা গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, তারা পারিবারিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর বোনের ছোট মেয়ের মুখের দিকে তাকালে তিনি চোখের পানি কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারেন না।
এই বিশাল শূন্যতা ও কষ্ট কখনোই দূর করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো পরিবারেরই এমন নিষ্ঠুর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহত এই নারীদের বেশিরভাগেরই বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং মৃত্যুর আগে তাদের সবার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
এসব ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে এখন পর্যন্ত মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ, যাকে প্রথম লাশ উদ্ধারের ঠিক দুই দিন পর আটক করা হয়। তবে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না যে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ধারাবাহিক খুনি বা সংঘবদ্ধ কোনো অপরাধী চক্র কাজ করছে কি না।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নাও থাকতে পারে, তবে তদন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। ধারাবাহিক এই হত্যাকাণ্ড দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার এক ভয়াবহ ও অন্ধকার চিত্র তুলে ধরেছে।
বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ নারী নির্যাতনের হার থাকা এই দেশটিতে নারীদের নিরাপত্তা বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ ত্রৈমাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৫ হাজার ৪২৭ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
যদিও সরকারি পরিসংখ্যানে ভুক্তভোগীদের লিঙ্গভিত্তিক আলাদা কোনো হিসাব দেওয়া হয় না, তবে দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংগৃহীত তথ্যমতে, কেবল ওই তিন মাসেই ৫৬৯ জন নারী নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। এর অর্থ হলো, দেশটিতে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ছয়জন নারী হত্যার শিকার হচ্ছেন।
এছাড়া একই সময়ে আরও ১ হাজার ৫২ জন নারী হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে দেশজুড়ে তুমুল বিক্ষোভ ও নারীদের অচলাবস্থা কর্মসূচির পর গত বছরের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার লিঙ্গভিত্তিক এই সহিংসতাকে 'জাতীয় দুর্যোগ' হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল।
সে সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে, একে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এই গভীর সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও পদক্ষেপ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনটির দেশীয় পরিচালক শেনিলা মোহাম্মদ মনে করেন, নারীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে লিঙ্গের কারণে হত্যার ঘটনাকে আইনে সম্পূর্ণ পৃথক অপরাধ অর্থাৎ 'নারী-হত্যা' হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া।
ইতিমধ্যে আফ্রিকার গ্যাবন ও মরক্কোসহ বিশ্বের অন্তত ৩৩টি দেশে এই অপরাধকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে। এদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এখুরুলেনির এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, তদন্তে কোনো দিকই অযত্নে রাখা হবে না।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, একটি জাতি হিসেবে সবাইকে অবশ্যই নারী ও মেয়েদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। স্থানীয় লিঙ্গ ও সামাজিক ন্যায়বিচারবিষয়ক অধিকারকর্মী লেবোগাং রামোফোকো এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতার পেছনে দীর্ঘদিনের উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের ঐতিহাসিক প্রভাব রয়েছে বলে গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের সহিংস সামাজিক ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব এখনো সমাজ থেকে পুরোপুরি দূর হয়নি। ক্রমবর্ধমান এই আতঙ্কের মধ্যে স্থানীয় নারীদের প্রাত্যহিক দিন কাটছে চরম ভীতিতে। কেম্পটন পার্ক এলাকায় সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা একটি স্থানীয় নারী অধিকার সংস্থার সদস্যরা এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছেন।
তাঁদের দাবি, শুধু সতর্ক থাকতে বললেই হবে না, বরং মানুষের বসবাসের এলাকাগুলোকে অবিলম্বে নিরাপদ করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী থেম্বি মাবেনা ও ৩২ বছর বয়সী থুলিসিলে সিবান্দের মতো অনেকেই এখন একা বাইরে বের হতে বা দোকানে যেতেও চরম ভয় পান।
২০ বছর বয়সী তরুণী লেরাতো মজিজির কথায় পুরো দেশের নারীদের বর্তমান অবস্থার এক করুণ সত্য ফুটে ওঠে। তিনি চরম হতাশা নিয়ে বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় নারীরা এখন আর কোনোভাবেই নিরাপদ নন।