তবে তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এই অতি-আক্রমণাত্মক ও যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতেও চরম সামরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে নিজেদের শর্ত মানাতে বাধ্য করার নীতি পুরোপুরি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।
ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই পুরোনো ও অকার্যকর কৌশলের পুনরাবৃত্তি এবারও কোনো ইতিবাচক বা ফলপ্রসূ ফলাফল বয়ে আনার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। বরং ওয়াশিংটনের এমন অনমনীয় অবস্থান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনিয়ন্ত্রিত ও সর্বাত্মক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে জোরালো আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, মাত্র এক মাস আগে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মূলত ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী চাপে পড়েছে।
আমেরিকার বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আধিপত্য সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা এবং তেহরানকে আমেরিকার দেওয়া কঠোর শর্তাবলি মেনে নিয়ে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা।
যদিও দুই দেশের মধ্যে এখনো পুরোদমে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবুও কূটনৈতিক উপায়ে এই গভীর সংকট মেটানোর সম্ভাবনা দিন দিন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই সামরিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ প্রভাবে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা ও মন্দার শঙ্কা তৈরি করেছে।
দুই পক্ষের মধ্যে চলমান এই প্রতিশোধমূলক সামরিক হামলা এখন টানা ষষ্ঠ দিনে পদার্পণ করেছে। এই তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ইরানও ওয়াশিংটনকে অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে। তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী যদি ইরানের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ ও সাধারণ নাগরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে কোনো ধরনের হামলা পরিচালনা করে, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
সে ক্ষেত্রে ইরান ইয়েমেনে অবস্থানরত তাদের শক্তিশালী হুথি মিত্রদের সরাসরি ব্যবহার করে লোহিত সাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সব ধরনের জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে দিতে পারে।
মার্কিন অভ্যন্তরীণ গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি-নির্ধারকদের শীর্ষ পর্যায়ে বর্তমানে ইরানের জ্বালানি উৎপাদন স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ সেতু, খার্গ দ্বীপে অবস্থিত প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র এবং মাটির গভীরে অবস্থিত অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ সরাসরি বিমান হামলা চালানোর বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে।
তবে স্বাধীন সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের অতি-সংবেদনশীল স্থাপনায় যেকোনো ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ হবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং তা বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার বিরুদ্ধে এক তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক শীর্ষ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, নতুন করে বোমাবর্ষণ কিংবা হামলার তীব্রতা বাড়ালেও ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান বদলানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
বরং মার্কিন আগ্রাসনের মুখে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষাকে আরও জোরদার করবে এবং আরও শক্ত অবস্থানে যাবে। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসের এই যুদ্ধংদেহী নীতির পক্ষে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও ইরান আসলে শুধু সামরিক শক্তির ভাষাই বোঝে।
তাই আন্তর্জাতিক নৌপথ ও প্রণালিগুলোতে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সশস্ত্র তৎপরতার জন্য তেহরানকে অবশ্যই সম্পূর্ণ জবাবদিহি করতে হবে। তবে এই আন্তর্জাতিক সংকটের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজের দেশেও তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি আকস্মিক ভেঙে যাওয়ায় একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা, হাজারো মানুষের সম্ভাব্য প্রাণহানি, যুদ্ধের বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা এবং আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশটিতে ট্রাম্পের নিজস্ব জনপ্রিয়তা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাওয়ার এক বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি স্থায়ী ও টেকসই সমঝোতায় পৌঁছানোর যে আলোচনা চলছিল, তা সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি দাবি করেছিলেন যে, ইরানে দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা এক মার্কিন নাগরিক মুক্তি পেয়েছেন, যা ইরানের বিচার বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে ও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছে।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ আনা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানি জাহাজে হামলা এবং সমুদ্রসীমায় ক্রমাগত উত্তেজনা সৃষ্টি করা পূর্ববর্তী চুক্তিগুলোর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় ইরানি বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে দেওয়া সব ধরনের বিশেষ সুবিধা ও ছাড় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন বাহিনীর চালানো ধারাবাহিক হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার আগে ইরানের সামগ্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া।
তবে ইরানও এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক সহযোগীদের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছে। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের হামলা যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর প্রধান প্রধান বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোও তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানের সামরিক কমান্ডের দাবি, তাদের অস্ত্রাগারে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমূক ক্ষয়ক্ষতি করার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণ অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোনের বিশাল মজুত রয়েছে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে যে, তেহরান ইতিমধ্যে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দেব প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যদি এমনটি ঘটে, তবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখোমুখি হবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনি প্রচারণায় বিদেশের মাটিতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ও যুদ্ধ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তার আগের মেয়াদের ভুল ও ব্যর্থ নীতির পুনরাবৃত্তি করছেন।
ইসরায়েলের স্বনামধন্য ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচ সমগ্র পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন বা পশ্চিমা বিশ্ব যতই প্রবল চাপ প্রয়োগ করুক না কেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব এত সহজে মার্কিন শর্তের সামনে নতি স্বীকার করবে না। বরং আমেরিকার পক্ষ থেকে হামলার মাত্রা যত বাড়বে, ইরানের দিক থেকেও ঠিক ততটাই জোরালো ও বিধ্বংসী পাল্টা জবাব আসবে।