রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

২০২৫ সালে দাবানলের রেকর্ড এবং প্রস্তুতির অভাব নিয়ে চরম সতর্কতা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর, ২০২৫, ০৮:৪৩ পিএম

২০২৫ সালে দাবানলের রেকর্ড এবং প্রস্তুতির অভাব নিয়ে চরম সতর্কতা
ছবি: AP

যুক্তরাজ্য বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও উদ্বেগজনক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে দাবানলের যে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে, তা অতীতের সকল রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যজুড়ে ৪৭,০২৬ হেক্টর জমি আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয়েছে।

 

২০১২ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই এক বছরে পুড়ে যাওয়া সর্বোচ্চ পরিমাণ এলাকা। এমনকি ২০২২ সালের রেকর্ডব্রেকিং গ্রীষ্মের তুলনায় এ বছর দ্বিগুণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা জলবায়ু সংকটের তীব্রতাকেই নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, ক্রমবর্ধমান দাবানল, বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য ‘বিপজ্জনকভাবে অপ্রস্তুত’।

 

ফায়ার ব্রিগেড ইউনিয়ন (এফবিইউ) সরকারের কাছে অবিলম্বে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে ‘অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ অগ্নিকাণ্ডের দিনগুলোর সংখ্যা তিনগুণ এবং ২০৮০ সালের মধ্যে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। কেবল আগুন নয়, তীব্র বৃষ্টিপাত এবং বন্যার ঝুঁকিও সমানভাবে বাড়ছে। সম্প্রতি ‘স্টর্ম ক্লডিয়া’র প্রভাবে ওয়েলস এবং ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অংশে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিতবাহী।

 

এই প্রেক্ষাপটে চ্যান্সেলর রেচেল রিভস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরো মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের কাছে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে ইউনিয়ন। সেখানে তারা ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে শক্তিশালী করতে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে দ্রুত জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে প্রায় ১২,০০০ অগ্নিনির্বাপক কর্মী বা ফায়ারফাইটার তাদের পদ হারিয়েছেন, যা মোট জনশক্তির এক-পঞ্চমাংশ।

 

কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল নগদ অর্থের হিসেবে ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যার ফলে অনেক স্টেশনে সরঞ্জামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ কক্ষগুলোতে কর্মীর অভাব প্রকট হয়েছে। ডরসেটের হোল্ট হিথ এলাকার একটি দাবানল নেভাতে সুদূর ম্যানচেস্টার থেকে দমকল বাহিনীকে তলব করতে হয়েছিল, যা এই সংকটের গভীরতা প্রমাণ করে।

 

অনেক কর্মীর কাছে দাবানল মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত সুরক্ষাসামগ্রী বা পিপিই ছিল না, ফলে তারা হিট স্ট্রোক ও গুরুতর দগ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন। ন্যাশনাল ফায়ার চিফস কাউন্সিলের মডেলিং অনুযায়ী, বাজেটের ঘাটতি পূরণে আরও ১০২ মিলিয়ন পাউন্ড বা ১১৬ মিলিয়ন ইউরো ছাঁটাই করা হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলবে।

 

যুক্তরাজ্যের বাইরে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের চিত্রও অত্যন্ত ভয়াবহ। চলতি বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১০ লাখেরও বেশি হেক্টর জমি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা কর্সিকার মোট আয়তনের চেয়েও বেশি। চেক রিপাবলিক, এস্তোনিয়া এবং লিথুয়ানিয়ার মতো কয়েকটি দেশ ছাড়া ইইউ-এর অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রই দাবানলের কবলে পড়েছে। বিশেষ করে স্পেন এবং পর্তুগালে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা এবং শুষ্ক বাতাসের কারণে সৃষ্ট দাবানল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

 

বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই ধরনের প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনা প্রায় ৪০ গুণ বেড়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অগ্নিনির্বাপণ খাতে ব্যয় বাড়ালেও, ইউনিয়ন নেতাদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের গতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়। এখন সময় এসেছে বন রক্ষণাবেক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সুরক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করার, নতুবা ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

 

- Euro News