আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বড়দিনের আগের দিন সংঘটিত এই বর্বরোচিত ঘটনার মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট।
সাজাপ্রাপ্ত ওই আসামির নাম ড্যানিয়েল হেনরি ক্রাচফিল্ড এবং তার বয়স বত্রিশ বছর। ইতিপূর্বে তিনি আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
আদালত তার বিরুদ্ধে জীবন বিপন্ন করার মারাত্মক অভিযোগসহ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখা ও বেআইনি অনুপ্রবেশের মতো একাধিক অপরাধের সত্যতা খুঁজে পাওয়ায় এই কঠোর শাস্তির নির্দেশ দেন।
ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটেছিল দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত টেইলেম বেন্ড এলাকার একটি জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্রে। ঘটনার দিন আসামি ড্যানিয়েল ভিক্টোরিয়া রাজ্যের পুলিশের কাছ থেকে বাঁচতে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন এবং সেই সময় তিনি একটি গ্রামীণ এলাকা থেকে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র চুরি করেন।
খবর পেয়ে জ্যেষ্ঠ কনস্টেবল লিয়াম বেনেটের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তাকে আটক করতে অভিযান চালায়। আত্মরক্ষার্থে এবং আসামিকে কাবু করতে কর্মকর্তা বেনেট তার ওপর মরিচের গুঁড়ার স্প্রে বা পেপার স্প্রে ব্যবহার করেছিলেন।
কিন্তু ড্যানিয়েল অত্যন্ত হিংস্রভাবে নিজের গাড়িটি চালু করে তীব্র গতিতে পেছনের দিকে নিয়ে যান এবং পেছনে থাকা পুলিশের টহল গাড়িটিকে সজোরে ধাক্কা মারেন। এরপর তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে গাড়িটির গতি বাড়িয়ে সরাসরি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মকর্তা বেনেটের ওপর তুলে দেন।
আকস্মিক এই হামলার কারণে ওই পুলিশ কর্মকর্তা নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পাননি। গাড়ির ধাক্কায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং গুরুতর আহত হন।
আদালতের বিচারক এমিলি টেলফার রায় ঘোষণার সময় উল্লেখ করেন, ঘটনার সময় দিনের আলো থাকার কারণে সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতি স্পষ্ট ছিল এবং আসামি জেনেশুনেই এই অপরাধ ঘটিয়েছেন।
এছাড়া ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, অপরাধ সংঘটনের সময় আসামি মারাত্মক মাদক মেথামফেটামিনের প্রভাবে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ছিলেন। এই নৃশংস হামলার ফলে কনস্টেবল লিয়াম বেনেটের একটি আঙুল ভেঙে যায়, দুই পায়ের হাড়ে প্রচণ্ড আঘাত লাগে এবং পায়ের লিগামেন্ট সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, এই ভয়াবহ জখমের কারণে তার পায়ের নিচের অংশ স্থায়ীভাবে বিকৃত হয়ে গেছে, যা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, পুলিশ কর্মকর্তারা জনস্বার্থে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, তাই সমাজ ও আদালতের দায়িত্ব হলো তাদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
আদালত আসামিকে সর্বমোট আট বছর দুই দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন, যার মধ্যে সাড়ে পাঁচ বছর জামিন অযোগ্য সময় হিসেবে গণ্য হবে। ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর অর্থাৎ ঘটনার দিন থেকেই আসামির এই সাজার মেয়াদ কার্যকর ধরা হয়েছে।
এর ফলে তিনি ২০৩০ সালের জুনের আগে প্যারোলে মুক্তির জন্য কোনো আবেদন করতে পারবেন না। কারাদণ্ডের পাশাপাশি জেল থেকে মুক্তির পর পরবর্তী সাত বছরের জন্য তার গাড়ি চালনার লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।
আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওয়েড বার্নস আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, এই সিদ্ধান্তটি সাধারণ জনগণের প্রত্যাশার সঠিক প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
একজন কর্তব্যরত সরকারি কর্মীর ওপর এমন পরিকল্পিত ও জঘন্য হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এই শাস্তি সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।