সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচ বছর নিজস্ব উৎপাদনহীন থাকার ঝুঁকিতে অস্ট্রেলিয়া: বন্ধ ইস্পাত কারখানা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম

পাঁচ বছর নিজস্ব উৎপাদনহীন থাকার ঝুঁকিতে অস্ট্রেলিয়া: বন্ধ ইস্পাত কারখানা
ছবি : এবিসি

অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র রেল ও কাঠামো ইস্পাত উৎপাদনকারী ঐতিহাসিক হোয়াইলা ইস্পাত কারখানার কয়লাভিত্তিক ব্লাস্ট ফার্নেস স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গভীর সংকটে পড়েছে দেশটির ভারী শিল্প খাত।

 

সংশ্লিষ্ট শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণভাবে কাঠামো ও রেললাইন তৈরির ইস্পাত উৎপাদনে সক্ষমতা ফিরে পেতে দেশটির প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার শিল্পশহর হোয়াইলায় অবস্থিত এই কারখানার প্রায় পাঁচশ কর্মীকে ছাঁটাই বা স্বেচ্ছায় অবসর দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে।

 

প্রায় ষাট বছরের পুরোনো এই ব্লাস্ট ফার্নেসটি গত এপ্রিল মাস থেকে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এটি মেরামত করে পুনরায় সচল করার একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর গত মাসে কর্তৃপক্ষ চুল্লিটি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

 

শ্রমিক অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের স্থানীয় শাখা সংগঠক শেন কারগার এবিসি নিউজের বিশেষ অনুষ্ঠান সেভেন থার্টিকে জানিয়েছেন, আধুনিক প্রযুক্তিতে কাঁচা আকরিক থেকে নতুন ইস্পাত তৈরি করতে ব্লাস্ট ফার্নেসের কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প নেই।

 

পুরোনো চুল্লিটির চরম অবনতি এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন উৎপাদনব্যবস্থা চালু করতে বাস্তবসম্মতভাবে অন্তত পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে হোয়াইলা কারখানার অবদান অপরিসীম।

 

জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত মোট অবকাঠামোগত ইস্পাতের প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ জোগান দিয়ে আসছিল এই একক প্রতিষ্ঠানটি। দেশটির অত্যন্ত পরিচিত বৃহৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে পশ্চিম সিডনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং পার্থের বিখ্যাত অপটাস স্টেডিয়াম নির্মাণে এই কারখানার তৈরি ইস্পাত সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে।

 

তদুপরি, অস্ট্রেলিয়ায় রেললাইনের জন্য বিশেষ ইস্পাত তৈরির একমাত্র উৎস ছিল এই কেন্দ্রটি। বর্তমানে কারখানাটিতে নিজস্ব ইস্পাত তৈরির প্রাথমিক চুল্লিটি অচল থাকায় জমিয়ে রাখা আধা-প্রস্তুত কাঁচামাল এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা উপাদান প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি ইস্পাত পণ্য সরবরাহের চেষ্টা চলছে।

 

শেন কারগার উল্লেখ করেন, খনি থেকে লোহা আকরিক উত্তোলন ও বিদেশে রপ্তানি কার্যক্রম যথারীতি স্বাভাবিক থাকলেও, অবকাঠামো ও রেল যোগাযোগের মূল ইস্পাত উপাদানের জন্য অস্ট্রেলিয়াকে এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য বহির্বিশ্বের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হচ্ছে।

 

এ বিষয়ে প্রভাবশালী বাণিজ্যিক সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইনেস উইলক্স গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হোয়াইলায় উৎপাদন কার্যক্রম যত দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকবে, সংশ্লিষ্ট দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য অস্ট্রেলিয়া তত দ্রুত হারিয়ে ফেলবে।

 

এর ফলে দেশের বাজার আমদানিকৃত বিদেশি ইস্পাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা স্থানীয় শিল্পায়নের পথচলাকে আরও রুদ্ধ করবে। তিনি দাবি করেন, রাজ্য ও জাতীয় স্বার্থে কারখানায় পুনরায় স্বাভাবিক উৎপাদন ফিরিয়ে আনার জন্য একটি স্পষ্ট, সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ রূপরেখা দ্রুত জাতির সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।

 

এদিকে পরিবেশবান্ধব আধুনিক শিল্পায়নের অংশ হিসেবে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া রাজ্য সরকার ও দেশটির কেন্দ্রীয় ফেডারেল সরকার যৌথভাবে প্রায় দুই বিলিয়ন বা দুইশত কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদানের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

 

এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো কারখানার জন্য সম্ভাব্য নতুন কোনো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে আকর্ষণ করা, যারা পরিবেশের কার্বন নির্গমন হ্রাসকারী আধুনিক বৈদ্যুতিক আর্ক ফার্নেস স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগ করবে।

 

অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল শিল্পমন্ত্রী টিম আয়ার্স জানিয়েছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে হোয়াইলায় উৎপাদন ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে।

 

সরকার বর্তমানে নতুন মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা দুটি চূড়ান্ত দরদাতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী জিন্দাল এবং অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব খনিজ প্রতিষ্ঠান এম রিসোর্সেস।

 

একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সর্ববৃহৎ ইস্পাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্লুস্কোপের হাতে রয়েছে চূড়ান্ত দরপ্রস্তাবের বিশেষ অধিকার। হোয়াইলার এই পরিস্থিতির পেছনে বিগত কয়েক বছরের চরম আর্থিক ও কাঠামোগত অব্যবস্থাপনাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা।

 

অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল, কয়লাভিত্তিক পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেসটি আরও কয়েক বছর নিয়মিত সেবা দিয়ে যাবে, যার ফলে নতুন বৈদ্যুতিক আর্ক ফার্নেসে রূপান্তরের অন্তর্বর্তীকালীন সময়টি নির্বিঘ্ন হতো। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর অভিযোগ, সাবেক মালিক সঞ্জীব গুপ্তার মালিকানাধীন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান জিএফজি অ্যালায়েন্সের অতিরিক্ত ব্যয় সংকোচন নীতি চুল্লিটির আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

 

উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে চুল্লির স্বাভাবিক তাপমাত্রার কার্যক্ষমতা কমিয়ে ধীরগতিতে চালানোর মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রাচীন চুল্লি সব সময় সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ও প্রচণ্ড তাপে চালু রাখাই প্রযুক্তিগত নিয়ম।

 

তাপমাত্রা কমানোর সেই ভুল সিদ্ধান্তের পর থেকেই চুল্লিটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ে। তবে সাবেক স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান জিএফজি অ্যালায়েন্সের একজন মুখপাত্র এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সব ধরনের অব্যবস্থাপনার দায় সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

 

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হোয়াইলার অর্থনৈতিক সমস্যা জিএফজি অধিগ্রহণের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল এবং তাদের চলে যাওয়ার পরেও তা শেষ হয়নি। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে শত প্রতিকূলতা, পুরোনো যন্ত্রপাতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত বিদেশি ইস্পাতের বেআইনি ডাম্পিংয়ের সঙ্গে লড়াই করেও জিএফজি অস্ট্রেলিয়ার সার্বভৌম ইস্পাতশিল্প ও শ্রমিকদের চাকরি টিকিয়ে রেখেছিল।

 

তারা জানায়, কারখানার বর্তমান পরিণতির পেছনে ধারাবাহিক মালিকানা পরিবর্তন, নীতিগত অস্পষ্টতা ও দীর্ঘমেয়াদি অবহেলা দায়ী। আন্তর্জাতিক পরিসরে ২০২১ সালে গুরুত্বপূর্ণ অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান গ্রিনসিল ক্যাপিটাল দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সংকটে ছিল জিএফজি।

 

পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া সরকার প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ অধিগ্রহণ করে প্রশাসক নিয়োগ করে। সেই সময় কারখানাটি প্রতিদিন গড়ে প্রায় পনেরো লাখ ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল।

 

সরকারিভাবে দায়িত্ব গ্রহণকারী প্রশাসনিক সংস্থা কোর্ডিয়ামেন্থা অনুসন্ধান চালিয়ে জানিয়েছে, বছরের পর বছর বিনিয়োগহীনতা, জরুরি যন্ত্রপাতির অপর্যাপ্ত বা শূন্য রক্ষণাবেক্ষণ এবং চরম অনিরাপদ পরিবেশের মধ্য দিয়ে কারখানাটি পরিচালিত হচ্ছিল।

 

এমনকি ফার্নেসে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন রক্ষাকারী পোশাকে বড় বড় ছিদ্র ছিল এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ না করায় সুরক্ষামূলক চশমা ও গ্লাভস পর্যন্ত নতুন করে কেনা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, জিএফজি অ্যালায়েন্সের আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের আইনি বৈধতা বর্তমানে বিশদভাবে খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

 

অভিযোগ রয়েছে, হোয়াইলায় উৎপাদিত মূল্যবান ইস্পাত পণ্য উৎপাদন খরচের চেয়েও কম মূল্যে জিএফজির অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর করা হতো। যুক্তরাজ্যেও এই গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও জালিয়াতির অভিযোগে সরকারি তদন্ত চলছে, যদিও মালিকপক্ষ তা সবসময় ভিত্তিহীন দাবি করে আসছে।

 

একই গ্রুপের তাসমানিয়া ও নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিক দেউলিয়া দশার শিকার হওয়ায় কর্মীদের পাওনা পরিশোধে সাধারণ করদাতাদের কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে।

 

উৎপাদন বন্ধ এবং কর্মী ছাঁটাইয়ের এই তীব্র অভিঘাত সরাসরি আছড়ে পড়েছে পুরো হোয়াইলা শহরের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে। শহরের অর্থনীতি শতভাগ ইস্পাত কারখানার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কাজ হারানো শত শত পরিবার চরম আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

 

বাড়িভাড়া, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা এখন সাধারণ নাগরিকদের নিত্যদিনের সঙ্গী। অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাবে স্থানীয় খেলাধুলা ও সামাজিক ক্লাবগুলোও অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত হয়েছে।

 

স্থানীয় নর্থ হোয়াইলা ফুটবল ক্লাবের খেলোয়াড় ও কোচদের একটি বড় অংশই কারখানার কর্মী হওয়ায় জীবিকার তাগিদে অনেকে শহর ছেড়ে রাজধানী পার্থ বা অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে, একটি ঐতিহ্যবাহী ইস্পাত কারখানার অচলাবস্থা কেবল অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নির্মাণ খাতের আত্মনির্ভরশীলতাকেই হুমকিতে ফেলেনি, বরং একটি সমৃদ্ধ শিল্পশহরের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের ওপরও এক গভীর কালো ছায়া ফেলেছে।

 

- এবিসি নিউজ