রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সামরিক পরিচয় ও ক্যান্সারের মিথ্যে গল্প, তদন্তে ফাঁস অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মেয়রের চাঞ্চল্যকর প্রতারণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর, ২০২৫, ০৮:০৪ পিএম

সামরিক পরিচয় ও ক্যান্সারের মিথ্যে গল্প, তদন্তে ফাঁস অস্ট্রেলিয়ার সাবেক মেয়রের চাঞ্চল্যকর প্রতারণা
ছবি: ABC News

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন কমিশন (CCC) তাদের দীর্ঘ তদন্ত শেষে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে নর্থ কুইন্সল্যান্ডের সাবেক মেয়র ট্রয় থম্পসনের বিরুদ্ধে ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণার গুরুতর প্রমাণ মিলেছে। তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মেয়র নির্বাচনে জেতার জন্য থম্পসন তার সামরিক সেবা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে যেসব দাবি করেছিলেন, তার সবই ছিল অসত্য, বিভ্রান্তিকর এবং সহানুভূতি আদায়ের কৌশল মাত্র।

 

বিশেষ করে, তিনি নিজেকে স্পেশাল এয়ার সার্ভিস রেজিমেন্ট (SAS)-এর সদস্য হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে তিনি কখনোই এই বিশেষ বাহিনীর অংশ ছিলেন না। সিসিসি-র প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ট্রয় থম্পসন কেবল আড়াই বছর অস্ট্রেলীয় সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ফোর্সে যুক্ত ছিলেন, কোনো এলিট ফোর্সে নয়। শুধু সামরিক পরিচয়ই নয়, তার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দাবিগুলোও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।

 

নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নিজেকে ‘ক্যান্সার জয়ী’ হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন যে তিনি খাদ্যনালীর ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। কিন্তু তদন্তকারীরা তার মেডিকেল রেকর্ড তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করেও ক্যান্সারের কোনো অস্তিত্ব বা চিকিৎসার প্রমাণ পাননি। এমনকি তার মৃগীরোগ বা এপিলেপ্সি থাকার দাবির সপক্ষেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি। পাশাপাশি, তার দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি থাকার দাবিটিও ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

 

ব্যক্তিগত জীবনের মিথ্যে তথ্যের বাইরেও, থম্পসনের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক গোপনীয়তা ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি কাউন্সিলের অত্যন্ত গোপনীয় নথিপত্র এবং ইমেইল একজন অননুমোদিত উপদেষ্টার কাছে পাচার করেছিলেন। ব্যক্তিগত ইমেইল এবং এনক্রিপ্ট করা হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তিনি অন্তত ৩২ বার সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার করেছেন।

 

ওই উপদেষ্টা, যাকে থম্পসন নিজের পকেট থেকে অর্থ প্রদান করতেন, কাউন্সিলের সিইও নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপনীয় প্রক্রিয়ার তথ্যও পেয়েছিলেন। এই ঘটনা টাউনসভিল সিটি কাউন্সিলে দীর্ঘ ১৮ মাসের অস্থিরতা ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছিল। এতসব অভিযোগ ও প্রমাণের পরেও ট্রয় থম্পসন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, তিনি কোনো অপরাধমূলক কাজ বা অসদাচরণ করেননি এবং তার দাবি, প্রকাশিত তথ্যগুলো তার অবস্থানকেই সমর্থন করে।

 

অবশ্য এর আগে গত বছর একটি টিভি সাক্ষাৎকারে তিনি অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন যে, অতীতে ১০০ বারেরও বেশি ‘কনকশন’ বা মাথায় আঘাত পাওয়ার কারণে তিনি হয়তো ভুল তথ্য দিয়ে থাকতে পারেন। গত বছরের অ্যানজাক ডে বা স্মৃতি দিবসে তিনি নিজের কোনো মেডেল না পরে বাবার মেডেল পরে অনুষ্ঠানে যোগ দিলে তার সামরিক পরিচয় নিয়ে প্রথম সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

 

তুমুল সমালোচনার মুখেও তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানালে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাকে পূর্ণ বেতনে ১২ মাসের জন্য বরখাস্ত করা হয়। যদিও সিসিসি তাদের তদন্তে থম্পসনের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো ফৌজদারি অভিযোগ আনেনি, তবে তারা ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রার্থীদের সততা নিশ্চিত করতে কঠোর আইনি সংস্কারের সুপারিশ করেছে।

 

কমিশন জানিয়েছে, প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই এবং মিথ্যে তথ্য প্রদানের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞার বিধান চালু করা জরুরি। অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং ভোটারদের আস্থা রক্ষায় এই প্রতিবেদনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

- ABC News