সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫
১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কিংবদন্তি অভিনেতা কলিন ফ্রিলসের ৫০ বছরের ক্যারিয়ারের আবেগঘন বিদায়

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর, ২০২৫, ০৭:২১ পিএম

কিংবদন্তি অভিনেতা কলিন ফ্রিলসের ৫০ বছরের ক্যারিয়ারের আবেগঘন বিদায়
ছবি: ABC News

সিডনির বেলভায়ার থিয়েটারে শেকসপিয়রের কালজয়ী নাটক ‘কিং লিয়ার’-এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নিজের ৫০ বছরের বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত অভিনেতা কলিন ফ্রিলস। ৭৩ বছর বয়সী এই প্রবীণ তারকা তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ‘ম্যালকম’, ‘মাঙ্কি গ্রিপ’ এবং ‘ওয়াটার র‍্যাটস’-এর মতো জনপ্রিয় কাজ উপহার দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

 

জীবনের এই পর্যায়ে এসে তিনি এই মঞ্চায়নকে কেবল একটি সাধারণ কাজ হিসেবে দেখছেন না, বরং একে এক পরম সৌভাগ্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন। ফ্রিলসের ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ১৯৮৬ সালের চলচ্চিত্র ‘ম্যালকম’, যেখানে তিনি এক সামাজিক যোগাযোগে অক্ষম ট্রাম উৎসাহীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই সিনেমাটি তাকে অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে সেরা অভিনেতার পুরস্কার এনে দিয়েছিল।

 

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, সিনেমাটি তৈরির জন্য পরিচালক ও প্রযোজককে নিজেদের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়েছিল এবং ফ্রিলস শুরুতে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করেছিলেন। এই সিনেমার প্রসঙ্গেই উঠে আসে তার সহশিল্পী জন হারগ্রিভসের কথা। শুটিংয়ের আগে মেডিকেল পরীক্ষার সময় হারগ্রিভস এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হন এবং পরবর্তীতে এইডসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

 

ফ্রিলস আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান, জন ছিলেন অসীম সাহসী এবং একজন চমৎকার মানুষ, যাকে তিনি আজও গভীরভাবে মিস করেন। বর্তমানে ‘কিং লিয়ার’ নাটকে ফ্রিলস এক বিশেষ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন, কারণ এখানে তিনি তার নিজের মেয়ে শার্লট ফ্রিলসের সাথে মঞ্চ ভাগাভাগি করছেন। নাটকে শার্লট রাজা লিয়ারের বড় মেয়ে ‘গনেরিল’-এর চরিত্রে অভিনয় করছেন।

 

ফ্রিলস গত এক বছর ধরে শেকসপিয়রের এই ট্র্যাজেডিটি গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন এবং মহড়া দিয়েছেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা নিজের সত্তাকে উজাড় করে দেওয়ায় বিশ্বাসী। তরুণ বয়সে একজন নির্মাণশ্রমিক হিসেবে জীবন শুরু করা ফ্রিলস একসময় সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন দেখে ড্রামা স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখান থেকে সিডনি থিয়েটার কোম্পানির ‘হ্যামলেট’ এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্রের পর্দায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

 

সিনেমার জগতে তার শুরুর পথচলা মসৃণ ছিল না। ‘মাঙ্কি গ্রিপ’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করতেন এবং পরিচালকরাও শুরুতে তাকে নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে নব্বইয়ের দশকে পুলিশ ড্রামা সিরিজ ‘ওয়াটার র‍্যাটস’-এ অভিনয়ের সময় তিনি ক্যামেরার সামনে নিজের জড়তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন এবং অভিনয়ের প্রকৃত আনন্দ খুঁজে পান।

 

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য চড়াই-উতরাই পার করেছেন, যা তাকে একজন পরিণত অভিনেতায় রূপান্তর করেছে। ব্যক্তিজীবনে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে ফ্রিলস নিজেকে কিছুটা পুরাতন ঘরানার মনে করেন এবং প্রযুক্তির আড়ম্বর থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করেন। তিনি দক্ষিণ সিডনির সাউদার্ন হাইল্যান্ডসে তার স্ত্রী, খ্যাতনামা অভিনেত্রী জুডি ডেভিসের সাথে বসবাস করেন এবং তিনি কখনোই কম্পিউটার ব্যবহার করেননি।

 

তিনি আধুনিক থিয়েটারে স্ক্রিন বা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের ঘোর বিরোধী। তিনি বিশ্বাস করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা এআই-এর যুগে মানুষ কেবল মানুষের সাথেই সংযোগ স্থাপন করতে চায়। তার মতে, থিয়েটারে ধোঁয়াশা বা জাদুকরী ট্রিকের প্রয়োজন নেই; বরং একজন মানুষ যখন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত হন, সেটাই প্রকৃত শিল্প। দর্শকদের মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনের প্রতি বিস্ময় জাগিয়ে তোলাই তার প্রধান লক্ষ্য। সিডনির বেলভায়ার সেন্ট থিয়েটারে ‘কিং লিয়ার’ নাটকটি আগামী ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মঞ্চস্থ হবে।

 

- ABC News