গত শনিবার দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনির ক্যামডেন এলাকায় পুলিশের ধাওয়া করা একটি চোরাই গাড়ির ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৬০ বছর বয়সী শিক্ষাবিদ লি ক্যাসুসেলি এবং ৮৪ বছর বয়সী মরিন ক্রসল্যান্ড। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়ার পুলিশি কার্যক্রমের নিরাপত্তা এবং যৌক্তিকতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এক উত্তপ্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নিহত লি ক্যাসুসেলি ছিলেন একজন অত্যন্ত সম্মানিত শিক্ষক এবং চ্যারিটি ডিরেক্টর। দুর্ঘটনার সময় তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং পাশের সিটে ছিলেন প্রবীণ নারী মরিন ক্রসল্যান্ড। এনএসডব্লিউ পুলিশ এই ঘটনাকে একটি ‘ক্রিটিক্যাল ইনসিডেন্ট’ বা গুরুতর ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
পুলিশের দাবি, দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ মিনিট আগেই তারা সরাসরি সড়কপথে ধাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল এবং পুলিশের হেলিকপ্টারের (পোলএয়ার) মাধ্যমে আকাশপথে সন্দেহভাজন গাড়িটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছিল। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি; বেপরোয়া গতির ওই চোরাই গাড়িটি নিরীহ ওই দুই নারীর গাড়িতে সজোরে আঘাত হানে।
লি ক্যাসুসেলির ছেলে আদ্রিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মায়ের স্মৃতিচারণ করে তাকে ‘নিঃস্বার্থ এবং অনুপ্রেরণাদায়ী’ মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যিনি দীর্ঘ ছয় বছর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ছিলেন। এই দুর্ঘটনার পর পুলিশের ধাওয়া করার প্রবণতা এবং এর ভয়াবহ পরিণতির পরিসংখ্যান সামনে এসেছে।
সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে এনএসডব্লিউ পুলিশ ৫,০২৯টি ধাওয়া পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে ৪৬৮টি ঘটনা সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতি বছরই এই সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে।
এর আগে ২০২১ সালে ক্যানবেরার এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর করোনার বা তদন্তকারী বিচারক সুপারিশ করেছিলেন যে, জননিরাপত্তার ‘মারাত্মক ঝুঁকি’ না থাকলে পুলিশের ধাওয়া করা উচিত নয়। তবে পুলিশ কমিশনার ম্যাল ল্যানিয়ন সেই সুপারিশ পুরোপুরি গ্রহণ করেননি।
তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন, ধাওয়া বন্ধ করার নিয়ম করলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং সমাজে ভুল বার্তা যাবে। অন্যদিকে, গ্রিনস পার্টির এমপি সু হিগিনসন পুলিশের এই অনড় অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জীবন বাঁচানোর জন্য যদি পুলিশকে তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়, তবে কেন তারা তা করছে না।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ভিনসেন্ট হারলি বিষয়টিকে একটি জটিল নৈতিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, পুলিশ ধাওয়া বন্ধ করলে অপরাধীরা মনে করতে পারে যে তারা আইনের ঊর্ধ্বে, যা সংঘবদ্ধ অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে।
আবার ধাওয়া করলে নিরীহ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। ক্যামডেনের এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, ধাওয়া বন্ধ করা বা চালিয়ে যাওয়া-উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকির মাত্রা অত্যন্ত প্রবল। বর্তমানে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং জনরোষের মুখে এই নীতিমালা আদৌ পরিবর্তন হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।