বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক সংঘাত রোধে পারমাণবিক অস্ত্রই একমাত্র কার্যকর ভরসা, ক্রেমলিনের দাবি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম

বৈশ্বিক সংঘাত রোধে পারমাণবিক অস্ত্রই একমাত্র কার্যকর ভরসা, ক্রেমলিনের দাবি
ছবি : Collected

বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী নতুন করে এক ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতার গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মাঝেই পরাশক্তি রাশিয়া প্রকাশ্যে দাবি করেছে যে, সম্ভাব্য সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক সংঘাত বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়াতে পারমাণবিক অস্ত্রই এখন একমাত্র কার্যকর প্রতিষেধক হিসেবে টিকে আছে।

 

গতকাল বুধবার রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ফোরামে ক্রেমলিনের শীর্ষ মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আনুষ্ঠানিকভাবে এই মন্তব্য করেন। তার এই স্পষ্ট ও কঠোর বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

উক্ত ফোরামে বক্তব্য প্রদানকালে দিমিত্রি পেসকভ বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর চরম অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে এর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, প্রচলিত বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং এর কার্যকারিতা বর্তমানে প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে।

 

বাস্তব পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান অস্থিতিশীল পৃথিবীতে পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার বাইরে আর কোনো দৃশ্যমান বা নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তাবলয় অবশিষ্ট নেই। ক্রেমলিনের এই শীর্ষ কর্মকর্তার মতে, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসলীলার ভয়ই সমগ্র বিশ্বকে একটি সর্বগ্রাসী ও চূড়ান্ত বৈশ্বিক সংঘাতের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছে।

 

পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতের আধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তির বিষয়েও বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেন। পেসকভ বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির অভাবনীয় ও দ্রুত উন্নয়নের ফলে অদূর ভবিষ্যতে এমন কিছু নতুন ধরনের অত্যাধুনিক অ-পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, যেগুলোর ধ্বংসক্ষমতা অনায়াসেই প্রচলিত পারমাণবিক অস্ত্রের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা মানবসভ্যতার জন্য এক নতুন হুমকির কারণ হবে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই কঠোর অবস্থানের পেছনে ইউক্রেনে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে। গত চার বছর ধরে ইউক্রেনে চলা এই সামরিক সংঘাতে রণক্ষেত্রের নানা উত্থান-পতনের মাঝে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একাধিকবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত সুকৌশলে প্রকাশ্যে তুলে এনেছেন।

 

তার এই ধরনের মন্তব্যের জেরে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো মস্কোর বিরুদ্ধে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং বিশ্বশান্তি বিনষ্টকারী পারমাণবিক হুমকি প্রদানের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে।

 

পশ্চিমা দেশগুলোর জোরালো দাবি, মস্কো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের এমন অনড় ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের পর বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক সমীকরণ সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে।

 

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন একটি যুগোপযোগী পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পক্ষে নিজের জোরালো মত প্রকাশ করেছেন। এই নতুন চুক্তিতে তিনি উঠতি পরাশক্তি চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করার একটি সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত প্রস্তাব দিয়েছেন।

 

যদিও বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাশিয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুবিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের তুলনায় চীনের বর্তমান মজুত বেশ ছোট, তবুও বেইজিং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ও নীরবে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে চলেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দাবি করে।

 

তবে বেইজিং প্রকাশ্যে এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার পশ্চিমা চাপকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, চীনের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে রাশিয়ার নিজস্ব একটি সুস্পষ্ট ও অনমনীয় ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে।

 

মস্কো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছে যে, নতুন কোনো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে যদি জোরপূর্বক বা কৌশলগত কারণে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, তবে ক্ষমতার বৈশ্বিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পারমাণবিক মিত্র দেশ যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকেও অবশ্যই সেই নতুন চুক্তির কঠোর বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে।

 

রাশিয়ার এই পাল্টা শর্তের কারণে একটি সর্বজনীন ও কার্যকর পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছানো এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির একটি বিশদ ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন থেকে এই পারমাণবিক সংকটের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়েছে।

 

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সর্বশেষ যে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিটি বলবৎ ছিল, তা মূলত চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই পুরোপুরি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

 

২০১০ সালে বিপুল আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে স্বাক্ষরিত হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্তম্ভ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ছিল। এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির আওতায় রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই নিজেদের অস্ত্রাগারে সর্বোচ্চ এক হাজার পাঁচশো পঞ্চাশটি করে মোতায়েনযোগ্য পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র রাখার আইনি অনুমতি পেয়েছিল।

 

কিন্তু চুক্তিটির মেয়াদ সফলভাবে শেষ হওয়ার ফলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তির ওপর থাকা সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি সীমাবদ্ধতাগুলো সম্পূর্ণভাবে উঠে গেছে। অবশ্য মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগে থেকেই উভয় দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্তাবলি চরমভাবে লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে আসছিল, যা চুক্তিটির ভবিষ্যৎকে আগেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল।

 

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এমন এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তিটি নবায়ন করা বা এর বিকল্প হিসেবে কোনো নতুন সমঝোতা নিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান বা ইতিবাচক অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।

 

এর ফলে দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে সমগ্র বিশ্ব প্রথমবারের মতো এমন একটি ভয়াবহ ও চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, যখন পরাশক্তিগুলোর পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বা এর অনিয়ন্ত্রিত প্রসার সীমিত রাখার জন্য কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তি বা আইনি কাঠামো বলবৎ নেই।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির এই ভয়াবহ শূন্যতা বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং নতুন করে শুরু হওয়া এই নীরব অস্ত্র প্রতিযোগিতা যেকোনো মুহূর্তে বিশ্বকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে শান্তিকামী বিশ্ববাসী গভীরভাবে আশঙ্কা করছে।

 

বার্তা বাজার