শনিবার, জুলাই ৪, ২০২৬
২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে
ছবি : Collected

বিশ্বের বৃহত্তম দুই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, নিশ্ছিদ্র শান্তি ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে এক বিশেষ, ঐতিহাসিক ও অনস্বীকার্য দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

 

শনিবার তুরস্কভিত্তিক সুপরিচিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত এক বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী বা আড়াই শতকের উদযাপনের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাঠানো এক বিশেষ ও উষ্ণ শুভেচ্ছা বার্তায় রুশ প্রেসিডেন্ট এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।

 

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির এক চরম উত্তেজনাকর, সংঘাতময় ও তীব্র মেরুকরণের এই জটিল সময়ে রাশিয়ার শীর্ষ নেতার এমন ইতিবাচক ও সহযোগিতাপূর্ণ বার্তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক ও গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

ক্রেমলিনের প্রকাশ করা দাপ্তরিক তথ্য ও বিবৃতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের এই ঐতিহাসিক ও উৎসবমুখর ক্ষণে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার আনুষ্ঠানিক বার্তায় কেবল প্রথাগত শুভেচ্ছাই বিনিময় করেননি, বরং দুই বৃহৎ পরাশক্তির মধ্যকার সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের নানা গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

 

পুতিন তার বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের ঘটনাটি কেবল মানচিত্রে একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মই দেয়নি, বরং এটি সমগ্র বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যুগান্তকারী ও অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এই আড়াই শতকের দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল যাত্রাকে তিনি অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখেছেন বলে তার এই সুচিন্তিত বার্তায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শেকড় টেনে রুশ প্রেসিডেন্ট তার বার্তায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল থেকে চিরতরে মুক্ত হওয়ার জন্য উত্তর আমেরিকার তৎকালীন উপনিবেশগুলো যখন স্বাধীনতার এক রক্তক্ষয়ী ও অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল, ঠিক সেই চরম সংকটময় মুহূর্তে রাশিয়া অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এবং কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক শর্ত ছাড়াই তাদের প্রতি নিজেদের নিঃশর্ত সমর্থন ব্যক্ত করেছিল।

 

দুই পরাশক্তির মধ্যকার এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ভিত্তি যে বহু পুরনো এবং তা যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই বিষয়টিই তিনি বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সামনে অত্যন্ত কৌশলে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

বিশ্ব ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির নানা জটিল চড়াই-উতরাই ও মতাদর্শগত পার্থক্য পেরিয়ে এই দুই দেশ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার শুভেচ্ছা বার্তায় আরও গভীরে গিয়ে দুই বিশ্বযুদ্ধে মস্কো ও ওয়াশিংটনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক দুটি বৈশ্বিক সংঘাতে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে কাজ করেছে।

 

বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিবাদের ভয়াবহ, আগ্রাসী ও পৈশাচিক বিস্তার থেকে সমগ্র মানবজাতিকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে এই দুই দেশের সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনগণের যৌথ আত্মত্যাগ এবং অসামান্য অবদান বিশ্ব ইতিহাসে অনস্বীকার্য হয়ে আছে।

 

পুতিন জোরালো ভাষায় বলেন, সে সময় মিত্র হিসেবে তারা কেবল শত্রুকে সামরিকভাবে পরাজিতই করেনি, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে জাতিসংঘসহ আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলতেও তারা একসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।

 

অতীতের এই সফল অংশীদারিত্ব এবং ঐতিহাসিক ঐক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিন বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাদের যৌথ কর্তব্যের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী দুটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি এক বিশাল, সংবেদনশীল ও এড়ানো অযোগ্য দায়িত্ব বর্তায়।

 

বৈশ্বিক নিরাপত্তা বলয়কে সুসংহত রাখা, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যেকোনো ধরনের বিপর্যয়কর সংঘাত এড়িয়ে বিশ্বে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই দুই পরাশক্তির পারস্পরিক বোঝাপড়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীল আচরণের কোনো বিকল্প নেই।

 

দুই দেশের নেতাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত সমগ্র বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে বলেও তিনি প্রচ্ছন্নভাবে ইঙ্গিত দেন। সবশেষে, ভ্লাদিমির পুতিন মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে গভীর ও ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

তিনি আন্তরিকভাবে আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের মধ্যে যদি বর্তমানের বৈরিতা কাটিয়ে পুনরায় একটি গঠনমূলক, সমমর্যাদাভিত্তিক এবং পারস্পরিক লাভজনক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তবে তা শুধু রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্যই ইতিবাচক হবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তা এক বিরাট আশীর্বাদ বয়ে আনবে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বৃহত্তর স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং বিশ্বশান্তি বজায় রাখার তাগিদে এই দুই পরাশক্তিকে অতীত বিভেদ ভুলে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে হবে এবং সহযোগিতার পথে হাঁটতে হবে-এমন একটি সুস্পষ্ট, গঠনমূলক ও ইতিবাচক কূটনৈতিক ইঙ্গিত রুশ প্রেসিডেন্টের এই শুভেচ্ছা বার্তায় প্রদান করা হয়েছে।

 

আনাদোলু এজেন্সি