দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সাহায্যে রাশিয়ার অভ্যন্তরে এতটা গভীরে গিয়ে নিখুঁত হামলা চালানোর এই ঘটনা ইউক্রেনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতারই এক সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
শুক্রবার রাতে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই সামরিক অভিযানের বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ও ফলাফল বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল রাশিয়ার ভলগোগ্রাদ শহরে অবস্থিত অন্যতম বৃহৎ সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফেডারেল গবেষণা ও উৎপাদন কেন্দ্র ‘টাইটান-বারিকাদি’।
এই বিশাল ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় ঘেরা কারখানাটিতে মূলত ইয়ার্স এবং টোপোল-এম-এর মতো কৌশলগত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার অত্যাধুনিক উৎক্ষেপণ যন্ত্র তৈরি করা হয়। এছাড়াও, যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বিধ্বংসী হিসেবে পরিচিত ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ যন্ত্রও এই কারখানার অন্যতম প্রধান উৎপাদন সামগ্রী।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, তাদের নিক্ষেপ করা ফ্লেমিঙ্গো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কারখানার নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং এর পরপরই কারখানার ভেতরের একটি বৃহৎ অংশে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্টের বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টাইটান-বারিকাদি কেবল একটি সাধারণ অস্ত্র কারখানা নয়, বরং এটি রাশিয়ার সামগ্রিক সামরিক-শিল্প খাতের মেরুদণ্ডস্বরূপ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। অত্যন্ত গোপনীয় ও স্পর্শকাতর এই সমরাস্ত্র কারখানায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ছাড়াও সেনাবাহিনীর জন্য ভারী কামান, নৌবাহিনীর ব্যবহারের উপযোগী আর্টিলারি এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে ব্যবহৃত জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উৎপাদন করা হয়ে থাকে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এই প্রতিষ্ঠানটির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তা সত্ত্বেও কারখানাটি রুশ বাহিনীর জন্য অবিরাম সমরাস্ত্র সরবরাহ করে আসছিল।
অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে সরাসরি ইউক্রেনের এই নির্দিষ্ট দাবি স্বীকার না করলেও, হামলার কারণে ওই অঞ্চলে অবকাঠামোগত ক্ষতির বিষয়টি আংশিকভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে। ভলগোগ্রাদ অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই বোচারভ এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন যে, রাতের আঁধারে ইউক্রেনের দিক থেকে ছুটে আসা উচ্চগতির কিছু অস্ত্র তাদের শহরের ওপর আঘাত হেনেছে।
এর ফলে শহরের ক্রাসনোওকতিয়াব্রস্কি জেলায় অবস্থিত একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন স্থাপনা ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও তিনি তার বক্তব্যে সরাসরি টাইটান-বারিকাদি কারখানার নাম উল্লেখ করা থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিরত থেকেছেন, তবে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এই নির্দিষ্ট কারখানাটি ওই ক্রাসনোওকতিয়াব্রস্কি জেলাতেই অবস্থিত।
গভর্নরের দেওয়া তথ্যমতে, এই আকস্মিক হামলায় অন্তত দশজন কর্মী আহত হয়েছেন এবং তাদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, অগ্নিনির্বাপণ কর্মীদের তৎপরতায় আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে এবং আশপাশের কোনো আবাসিক ভবনের ক্ষতি হয়নি।
ভলগোগ্রাদ প্রশাসনের এই মন্তব্যের বাইরে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তারা দেশের দশটি ভিন্ন অঞ্চলে এবং অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ইউক্রেনের ছোড়া প্রায় ১৭৫টি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভলগোগ্রাদে এই সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সমরাস্ত্র কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে মস্কোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সমান্তরালভাবে, ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, একই রাতে তারা অধিকৃত ক্রিমিয়ার ফিওদোসিয়া এলাকায় মোতায়েন করা রাশিয়ার একটি অত্যাধুনিক প্যান্টসির-এস১ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এবং কের্চ অঞ্চলে একটি গাড়িবাহী ফেরিতেও সফল হামলা চালিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদন সক্ষমতা দুর্বল করা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সৈন্যদের রসদ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতেই কিয়েভ ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার সামরিক-শিল্প স্থাপনাগুলোকে প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।