আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একই সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনীতি এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে ইউক্রেনের এই দ্বিমুখী আক্রমণ মস্কোর জন্য একটি নতুন ও গভীর চাপের সৃষ্টি করেছে। রুশ প্রশাসনের স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রাথমিক তথ্য এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার রাতে রাশিয়ার ক্রাসনোদার ক্রাই অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনী ব্যাপক মাত্রায় ড্রোন হামলা চালায়।
এই আকস্মিক ও ভয়াবহ হামলায় ওই অঞ্চলের একটি প্রধান তেল ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি এবং ভিডিও ফুটেজে ক্রাসনোআর্মেইস্কি জেলার পলতাভস্কায়া তেল ডিপো থেকে আগুনের বিশাল ও গগনচুম্বী শিখা এবং ঘন কালো ধোঁয়া আকাশের দিকে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে দেখা গেছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ওই জেলার প্রশাসনিক প্রধান আলেকজান্ডার খারলিতোনভ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে, আকাশে প্রতিহত করা ইউক্রেনীয় ড্রোনের জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিচে তেল ডিপোর ওপর আছড়ে পড়ার কারণেই মূলত এই বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে।
তবে এই হামলায় ঠিক কী পরিমাণ আর্থিক বা কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অথবা কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, ইউক্রেনভিত্তিক স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ‘কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্ট’ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই ড্রোন হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী বা কিয়েভ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য বা দায় স্বীকার করা হয়নি।
এমনকি যুদ্ধকালীন সীমাবদ্ধতার কারণে স্বাধীনভাবে এই হামলার সম্পূর্ণ দাবি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাও আপাতত সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুরোদমে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে রাশিয়ার ক্রাসনোদার অঞ্চলসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকার গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
কিয়েভ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দাবি ও কৌশলগত ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়ভার এবং অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস হলো তাদের তেল ও জ্বালানি খাত। তাই এই খাতটিকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করে দিতে পারলেই রাশিয়ার আক্রমণাত্মক সক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
রাশিয়ার অভ্যন্তরে এই জ্বালানি সংকটের খবরের পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রের একেবারে দক্ষিণাঞ্চলীয় ফ্রন্ট লাইন থেকেও ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংবাদ আসতে শুরু করেছে। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষিণ প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয়েছে যে, ২০২২ সালের শুরু থেকে রাশিয়ার নিরঙ্কুশ দখলে থাকা অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা কিনবার্ন স্পিট থেকে রুশ বাহিনী অবশেষে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক দিন ধরে ওই অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে অবিরাম ও তীব্র গোলাবর্ষণের মুখে টিকতে না পেরে রুশ সেনারা তাদের দীর্ঘদিনের মজবুত অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পিছু হটার পর দখলমুক্ত ওই অঞ্চলটিতে ইউক্রেনীয় সেনারা ইতোমধ্যে তাদের নিজস্ব জাতীয় পতাকা সগর্বে উত্তোলন করেছে বলে জানানো হয়েছে। মাইকোলাইভ অঞ্চলে অবস্থিত এই কিনবার্ন স্পিট মূলত একটি দীর্ঘ ও সরু বালুকাময় উপদ্বীপ, যা ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ডনিপ্রো-বুহ নদীর মোহনা এবং কৃষ্ণসাগরের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত।
প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি ২০২২ সালের মার্চ মাসে খেরসন অঞ্চলের দখলকৃত অংশ থেকে প্রবেশ করে রুশ বাহিনী নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। সামরিক ও বাণিজ্যিক উভয় দিক থেকেই এই অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান।
কারণ, এই উপদ্বীপের অবস্থানগত সুবিধার কারণে এখান থেকে খুব সহজেই কৃষ্ণসাগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণ করা এবং শত্রু বাহিনীর চলাচলের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো সম্ভব হয়। এছাড়া খেরসন ও মাইকোলাইভ সমুদ্রবন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শিপিং রুট বা জাহাজ চলাচলের পথও এই এলাকার একেবারে কাছ দিয়েই অতিক্রম করেছে।
এদিকে, কিনবার্ন স্পিট পুনরুদ্ধারের খবরের পাশাপাশি একই সময়ে সমগ্র কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে। ক্রাসনোদার অঞ্চলের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত এবং রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও ভয়াবহ ড্রোন হামলার জেরে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ব্ল্যাকআউটের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যপটে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়ার একেবারে অভ্যন্তরে এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহুদূরের গভীর লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানার জন্য ইউক্রেন এখন নিজেদের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে।
বিশেষ করে রাশিয়ার তেল শোধনাগার, সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে কিয়েভের এই ধারাবাহিক আক্রমণ যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন মাত্রার যোগ করেছে।