ইরানের শীর্ষ কূটনৈতিক মহল থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর এমন ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসনে সহায়তা করার কারণে এই দেশ দুটিকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের দায়ভার নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘনের এই গুরুতর অভিযোগ এমন এক সময়ে উত্থাপিত হলো, যখন দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ইরানের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ হলো ন্যাটোর বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুটের সাম্প্রতিক একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া ওই বিশেষ সাক্ষাৎকারে ন্যাটোর মহাসচিব অত্যন্ত খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছিলেন যে, সাম্প্রতিক ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে ন্যাটোভুক্ত কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ, বিশেষ করে ইতালি ও রোমানিয়া উল্লেখযোগ্য সামরিক ও কৌশলগত সহায়তা প্রদান করেছিল।
মার্ক রুটের সেই দাবির সূত্র ধরে জানা যায়, সামরিক অভিযান চলাকালে ইতালি তাদের নিজস্ব বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০০ অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করেছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই বৃহৎ পরিসরের অভিযানকে নির্বিঘ্ন ও সফল করতে রোমানিয়া তাদের রাজধানী বুখারেস্টের আকাশপথে সমস্ত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করেছিল।
ন্যাটোর শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক সামরিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ন্যাটোর মহাসচিবের এমন বক্তব্যের পর বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি অত্যন্ত কড়া ও দীর্ঘ বিবৃতি প্রকাশ করেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই।
তিনি তার বার্তায় অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ন্যাটোর মহাসচিব নিজেই যখন অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে স্বীকার করেছেন যে ইতালি ও রোমানিয়া ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা আগ্রাসনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল, তখন এর দায় কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়।
ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইতালি, রোমানিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই বর্বরোচিত আগ্রাসনে নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোকে আজ হোক বা কাল, তাদের নিজেদের দেশের সাধারণ জনগণ এবং সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্য ও নির্লজ্জ আগ্রাসন এবং নিরীহ ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত ব্যাপক নৃশংসতার সঙ্গে তারা কেন নিজেদের ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্ত করেছে, বিশ্ববাসী তা জানতে চায়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই মুখপাত্র ন্যাটোর মহাসচিবের ওই বিতর্কিত মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট ও মারাত্মক লঙ্ঘনের একটি প্রামাণ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার কূটনৈতিক মূল্যায়নে, এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ যুদ্ধ পরিচালনায় পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং গভীর উদ্বেগজনক প্রমাণ।
ইসমাইল বাঘাই তার আনুষ্ঠানিক হুঁশিয়ারিতে আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, ন্যাটো জোট হিসেবে এবং এই ধ্বংসাত্মক ও হঠকারী সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকটি সদস্য রাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে এর সমস্ত আইনি, রাজনৈতিক ও সামরিক পরিণতির জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের সামনে জবাবদিহি করতে হবে।
প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রাচ্যের এই সাম্প্রতিক ও ভয়াবহ সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা লঙ্ঘন করে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ বিমান হামলা শুরু করে।
ওই অভাবনীয় ও আকস্মিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক কমান্ডার এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। দেশমাতৃকার এই অপূরণীয় ক্ষতির পর ইরান অত্যন্ত কঠোর ও আগ্রাসী পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান জলপথ হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের অভাবনীয় কৌশলগত সামরিক চাপের মুখে পশ্চিমা বিশ্ব পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত গত ৮ এপ্রিল একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গত ১৭ জুলাই তেহরান ও ওয়াশিংটনের শীর্ষ পর্যায়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো সব ফ্রন্টে স্থায়ীভাবে যেকোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘাত বন্ধ করা এবং আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত, টেকসই ও সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার পথ প্রশস্ত করা।
তবে ন্যাটোর দেশগুলোর ভূমিকার বিষয়ে ইরানের এই নতুন ও কঠোর অবস্থান চলমান এই স্পর্শকাতর শান্তি প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে।