শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউরোপজুড়ে রেকর্ডভাঙা তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত জনজীবন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

ইউরোপজুড়ে রেকর্ডভাঙা তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত জনজীবন
ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপ মহাদেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ দাবদাহের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অঞ্চলটির বেশ কয়েকটি দেশে তাপমাত্রা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

 

বিশেষ করে জার্মানি, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসে চলতি জুন মাসের ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র এই চরম আবহাওয়ার কারণে স্পেন ও ফ্রান্সে প্রাণহানির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

 

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সংশ্লিষ্ট দেশের স্থানীয় প্রশাসন কনসার্ট, ম্যারাথন ও রাজনৈতিক শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন ধরনের জনসমাগম ও উৎসবের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ অথবা বাতিল ঘোষণা করেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 

আবহাওয়া পূর্বাভাসের তথ্যানুযায়ী, জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর সারব্রুকেনে সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী এই শহরটিতে চলতি সপ্তাহেই টানা তিনবার তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হলো, যা স্থানীয় জলবায়ুর তীব্র পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

 

ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, তীব্র গরমে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাওয়া বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

অন্যদিকে, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মুখপাত্র ক্লেয়ার নুলিস মানবস্বাস্থ্য, বাস্তুসংস্থান, কৃষি উৎপাদন এবং শ্রমশক্তির ওপর এই চরম আবহাওয়ার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্ভাগ্যবশত মানবজাতিকে এখন থেকে এই ধরনের চরম পরিস্থিতির সঙ্গেই অভ্যস্ত হতে হবে।

 

আবহাওয়াবিদদের মতে, ইউরোপের এই তীব্র দাবদাহের প্রভাব ধীরে ধীরে উত্তর ও পূর্ব অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বেলজিয়ামের আবহাওয়াবিদ ডেভিড ডিহানাউ জানিয়েছেন, নেদারল্যান্ডস সীমান্তের কাছে অবস্থিত ক্লাইন ব্রোগেল নামক স্থানে তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করেছে।

 

একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের দক্ষিণাঞ্চলীয় লিম্বুর্গ প্রদেশে সর্বোচ্চ ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং যুক্তরাজ্যের সাফোকের ক্যাভেন্ডিশে জুন মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির এক পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, গত শুক্রবার ইউরোপ মহাদেশের অন্তত ১৫ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে বেশি তীব্র তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, শনিবার এই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে ২০১২ সালের পূর্ববর্তী সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।

 

জলবায়ু বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর গবেষকরা জানিয়েছেন, বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট একটি শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয়ের কারণে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন এবং দক্ষিণ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫ থেকে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি অবস্থান করছে।

 

বছরের অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় জুন মাসের তাপমাত্রা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। গবেষকদের মতে, বর্তমান এই তীব্র দাবদাহ ইউরোপ অঞ্চলের নথিবদ্ধ ইতিহাসের মধ্যে ‘সবচেয়ে মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী’ চরম আবহাওয়ার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

 

এই তীব্র তাপপ্রবাহের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের হাসপাতালগুলোতে তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীর সংখ্যা ও চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

এমন পরিস্থিতিতে অসুস্থ, প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ নির্দেশনায় দুটি বড় গণজমায়েত বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘প্যারিস প্রাইড’ মার্চ আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আয়োজনের নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

 

এ ছাড়া গত বছর প্রায় আড়াই লাখ দর্শকের সমাগম হওয়া বিখ্যাত ‘সলিডেস’ সংগীত উৎসবও সম্পূর্ণ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। নেদারল্যান্ডসে আয়োজিত ‘ডেফকন ১’ নামক একটি বিশাল সংগীত উৎসবে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হলেও আবহাওয়া দপ্তরের ‘লাল সতর্কতা’ জারির কারণে প্রশাসন মাঝপথেই অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে দেয়।

 

এর পাশাপাশি জার্মানিতেও জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শনিবারের পূর্বনির্ধারিত ‘হামবুর্গ হাফ ম্যারাথন’ সহ অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া বিষয়ক বড় আয়োজন বাতিল করা হয়েছে।

 

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের এই ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, অন্যথায় প্রতি বছর গ্রীষ্মকালে ইউরোপজুড়ে এমন মানবিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

 

- বিবিসি