দেশটিতে অত্যধিক গরমে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে ইতোমধ্যে অন্তত এক হাজার মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানির তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার ফ্রান্সের জাতীয় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা 'স্যঁতে পাবলিক'-এর প্রকাশিত এক প্রাথমিক পরিসংখ্যানে এই উদ্বেগজনক ও শোকাবহ তথ্য জানানো হয়েছে।
তবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে পানিশূন্যতা ও অন্যান্য পরোক্ষ শারীরিক অসুস্থতায় আরও অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা এখনও এই প্রাথমিক পরিসংখ্যানের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বর্তমান এই হিসাবের চেয়ে আরও বহুগুণ বেশি হতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। স্যঁতে পাবলিক-এর প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিহতদের সিংহভাগই বয়স্ক নাগরিক।
বিশেষ করে পঁয়ষট্টি বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষজন এই চরম বৈরী তাপমাত্রায় সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বৃদ্ধাশ্রম বা কেয়ার হোম এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসাবাড়িগুলোতে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর তথ্যগুলো সম্পূর্ণভাবে সংগৃহীত হলে প্রাণহানির এই দুঃখজনক পরিসংখ্যান আরও দীর্ঘ হবে বলে মনে করছেন চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কেবল ফ্রান্স নয়, বর্তমানে সমগ্র ইউরোপ মহাদেশজুড়েই এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
এই চরম ও বিরূপ আবহাওয়ার কবলে পড়ে এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ চরম বিপর্যস্ত ও অসহায় সময় পার করছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অসহনীয় তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ইতোমধ্যে বেশ কয়েক ডজন মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের এই তীব্র তাপপ্রবাহ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এর ফলে কেবল জনজীবনই নয়, বরং ইউরোপের সার্বিক অর্থনৈতিক ও ভৌত অবকাঠামোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তীব্র গরমের কারণে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার জন্য বিদ্যুতের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে চরম প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা এই মহাদেশীয় সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন, গত বিশে জুন থেকে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহ ইউরোপের আধুনিক ও রেকর্ডকৃত ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী। আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারের চেয়ে ইউরোপের জলবায়ু অনেক বেশি দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত ও উষ্ণ হয়ে উঠছে।
এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার লড়াইয়ে এক বিশাল অশনিসংকেত বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। ফ্রান্সের সামগ্রিক আবহাওয়া পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় একেবারে শেষ হয়ে যায়নি।
আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই চরম তাপপ্রবাহ বর্তমানে ফ্রান্সের পূর্ব দিকের অঞ্চলগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। দেশটির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা তাদের সর্বশেষ বুলেটিনে জানিয়েছে, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে চরম গরমের তীব্রতা কিছুটা কমতে শুরু করলেও, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকা এখনও তাপপ্রবাহের চরম সতর্কবার্তার আওতায় রয়ে গেছে।
উদ্ভূত এই পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ অবস্থানে রয়েছে ফরাসি সরকার। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ট জনগণের প্রতি বিশেষ সতর্কতা জারি করে বলেছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার পরও এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহের প্রভাবে সৃষ্ট শারীরিক দুর্বলতা ও ক্ষতিকর প্রভাব মানুষের শরীরে আরও প্রায় দশ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ফরাসি স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্থানীয় একটি স্বনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএম-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশবাসীর প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করে বলেছেন যে, এই মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগটি এখনও সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়নি, তাই কোনোভাবেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার বা সতর্কতা কমানোর সুযোগ নেই।
জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা স্যঁতে পাবলিক তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদনে সাধারণ মানুষকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, মৃত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই প্রবীণ নাগরিক হলেও, তীব্র এই গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি কেবল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
শিশু, তরুণ এবং মাঠে কাজ করা কর্মক্ষম ব্যক্তিসহ সব বয়সী মানুষের ওপরই এই চরম বৈরী আবহাওয়া মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক ও নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির দেওয়া তথ্যমতে, ইউরোপের দেশগুলোর সরকার ও সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে এই অভূতপূর্ব জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।