তাঁর মতে, তেহরানের জন্য হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কোনো অংশেই পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে কম নয়। পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছেন যে, লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি আরও বেশি শক্তিশালী একটি কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু।
মধ্যপ্রাচ্যে যদি কোনো কারণে আঞ্চলিক উত্তেজনার পারদ আরও বৃদ্ধি পায়, তবে এই প্রণালির ওপর প্রভাব পড়ার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে যেতে পারে।
সম্প্রতি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁর স্মরণসভায় অংশ নিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত হিসেবে তেহরান সফর করেন দিমিত্রি মেদভেদেভ।
এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কূটনৈতিক সফরের অংশ হিসেবে তিনি ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে একটি বিশেষ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে তিনি প্রেসিডেন্ট পুতিনের পাঠানো গভীর শোকবার্তা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন এবং দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ‘রিয়া নভোস্তি’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যুতে মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা তাদের ‘সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’-র কাঠামোর আওতায় অত্যন্ত সুচারুভাবে অব্যাহত রয়েছে।
তেহরান সফরকালে এই ঐতিহাসিক শহরকে একটি ‘প্রাণবন্ত ও দ্রুত বিকাশমান’ নগরী হিসেবে আখ্যায়িত করেন মেদভেদেভ। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, তেহরানের এই সফর তাঁর মনে এক ইতিবাচক ও সুগভীর রেখাপাত করেছে।
সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির আগ্রাসনের মুখে ইরান অত্যন্ত মর্যাদা ও অসীম সাহসিকতার সঙ্গে অন্যতম কঠিন একটি অস্তিত্ব রক্ষার পরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেছে।
একই সঙ্গে তিনি তেহরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন ও উসকানিমূলক বলে তীব্র নিন্দা জানান। এই জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী রুশ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে মস্কোর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে রাশিয়া সর্বদা শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক পথকেই সমর্থন করে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
তবে বাস্তবতার নিরিখে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চূড়ান্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন ও জটিল একটি কাজ হবে। মেদভেদেভের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সবাই ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার পক্ষে নন।
তা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন, অতীতে যেসব আন্তর্জাতিক সমঝোতা অর্জিত হয়েছিল, সেগুলো ভবিষ্যতের যেকোনো গঠনমূলক আলোচনার শক্ত ভিত্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
পুতিনের এই বিশেষ দূত কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সম্পূর্ণ আলোচনা বন্ধ থাকার চেয়ে যেকোনো পর্যায়ের আলোচনা চলমান থাকা সব সময়ই বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক।
তিনি প্রবল আশা প্রকাশ করেন যে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে আলোচনা একসময় সফলতার মুখ দেখবে। তবে একই নিঃশ্বাসে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে এ কথাও বলেছেন যে, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে আলোচনার গতিপথ যেকোনো মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভিন্ন দিকেও মোড় নিতে পারে।
তেহরান সফরের সময় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মেদভেদেভ এক অভিনব ও সময়োপযোগী ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আন্তর্জাতিক মহলে একতরফা নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া দেশগুলোকে নিয়ে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গঠনের জোরালো প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তাঁর মতে, রাশিয়া, ইরান এবং চীনের মতো যেসব দেশ বর্তমানে পশ্চিমাদের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সরাসরি সম্মুখীন হচ্ছে, তারা নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি যৌথ কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। এই কাঠামোর মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সবশেষে মেদভেদেভ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সমুদ্রপথের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল সংকীর্ণ পথগুলোর (চোকপয়েন্ট) ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যে ইরানের জন্য কৌশলগত অস্ত্রের সমতুল্য এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিরোধমূলক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এক ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হয়, তবে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটার ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
তাই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার যেকোনো সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই স্পর্শকাতর বিষয়টি অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। আনাদোলু এজেন্সির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই ভূরাজনৈতিক চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে।