রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজারবাইজানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্লাস বর্জন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:২৫ পিএম

আজারবাইজানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ, শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্লাস বর্জন
ছবি: সংগৃহীত

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র আজারবাইজানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের হিজাব পরার ওপর নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সরকারি এই আকস্মিক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও গভীর অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

 

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা নারী শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম মাত্রার মানসিক উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। এই নির্দেশনার প্রতিবাদস্বরূপ ইতোমধ্যে দেশটির বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা একযোগে ক্লাস বর্জন কর্মসূচির ডাক দিয়েছে।

 

মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং শিক্ষার মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার দাবিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ আজারবাইজানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় এক নতুন ও অনাকাঙ্ক্ষিত মেরুকরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

জানা গেছে, গত একুশে সেপ্টেম্বর আজারবাইজানের মন্ত্রিসভা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন ও কঠোর নির্দেশিকা জারি করে। এই নির্দেশিকার মাধ্যমে মূলত স্কুলগুলোর ড্রেস কোড বা সরকার নির্ধারিত পোশাকবিধিতে ব্যাপক ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়।

 

এই নিয়মের আওতায় শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের পোশাকের ক্ষেত্রেও একগুচ্ছ কঠোর বিধিনিষেধ চালু করা হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতির আরও বেশি অবনতি ঘটিয়েছে।

 

নতুন এই পোশাকবিধি প্রণয়নের পরপরই তা অত্যন্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। রাজধানী বাকুর নগর শিক্ষা বিভাগ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছে যে, শহরের প্রতিটি সরকারি ও অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলোতে নতুন এই পোশাকবিধি কীভাবে এবং কতটুকু কার্যকর করা হচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা শুরু হবে।

 

প্রশাসনিক এই কড়া নজরদারির ঘোষণায় সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে একধরনের ভীতি ও তীব্র অনিশ্চয়তা কাজ করছে। অনেকেই মনে করছেন, এই কঠোর পর্যবেক্ষণের আড়ালে মূলত ধর্মীয় পোশাক পরিধানকারী নারী শিক্ষার্থীদের কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

 

সরকারের এই একগুঁয়ে পদক্ষেপের ফলে অসংখ্য হিজাব পরিহিত ছাত্রী তাদের স্বাভাবিক ও বাধাহীন শিক্ষাজীবন থেকে চিরতরে ছিটকে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি সুস্থ, সুন্দর ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের পথে প্রধান অন্তরায়।

 

আজারবাইজানের স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম মেইদান টিভির একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিও ও স্থিরচিত্র থেকে দেশজুড়ে চলমান এই প্রতিবাদের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বাকুর ঐতিহ্যবাহী ঊনসত্তর নম্বর স্কুল এবং মাসাল্লি জেলার মোল্লাওবা গ্রামের বি শিরিয়েভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের এই বিধিনিষেধের প্রতিবাদে তাদের নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।

 

শিক্ষার্থীদের এই অভূতপূর্ব বয়কট কর্মসূচি নিছক কোনো বিশৃঙ্খলা বা সাময়িক আবেগ নয়, বরং এটি তাদের সহপাঠীদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা এবং মৌলিক অধিকার আদায়ের এক নীরব অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী সংগ্রাম।

 

আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রধান এবং একমাত্র দাবি হলো-হিজাব পরিহিত যে সকল ছাত্রীকে স্কুলগেটে বা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে, অবিলম্বে তাদের সসম্মানে পড়ালেখায় ফিরে আসার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।

 

নিজেদের প্রিয় সহপাঠীদের মৌলিক শিক্ষার অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা এই অহিংস প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে আজারবাইজানের সংবিধান এবং সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলের বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

 

দেশের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনা মূল্যে এবং বাধ্যতামূলক সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কিন্তু সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব বা অন্য কোনো ধরনের ধর্মীয় পোশাক পরিধান করার আইনি অধিকার নিয়ে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া নেই।

 

সাংবিধানিক এই নীরবতা বা আইনি শূন্যতার সুযোগ নিয়েই শিক্ষা প্রশাসন পোশাকবিধির নামে হিজাব নিষিদ্ধ করার মতো একটি চরমপন্থি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জোরালো অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীরা।

 

তাদের সুস্পষ্ট দাবি, পোশাকের মতো একটি ঠুনকো অজুহাতে যদি কোনো নারী শিক্ষার্থীকে তার শিক্ষা থেকে সরাসরি বঞ্চিত করা হয়, তবে তা সরাসরি দেশের সংবিধানের দেওয়া বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকারকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে। এটি কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপই নয়, বরং নারী শিক্ষার সামগ্রিক অগ্রগতির পথেও একটি বিশাল বাধা।

 

শিক্ষার্থীদের এই চলমান ও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পাশাপাশি এই ঘটনার প্রতিবাদে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা। হিজাব পরা ছাত্রী এবং শিক্ষকদের পোশাকের ওপর আরোপিত এই অযৌক্তিক ও মানবাধিকার পরিপন্থী বিধিনিষেধের প্রতিবাদ জানিয়ে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে একাকী আমরণ অনশন শুরু করেছেন কারাবন্দি প্রখ্যাত আজারবাইজানি সাংবাদিক পোলাদ আসলানভ।

 

তিনি আজারবাইজানের অত্যন্ত সুপরিচিত ও জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম 'জেবারমান'-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া তার এই অনশন কর্মসূচির খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন তার স্ত্রী গুলমিরা আসলানভা।

 

পোলাদ আসলানভ তার লিখিত বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরিহিত ছাত্রীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতার ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের বিষয়টি সমগ্র দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে আনতেই তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন।

 

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে অভিযোগ করেছেন যে, রাষ্ট্রের এই বৈষম্যমূলক ও দমনপীড়নমূলক নীতির কারণে খোদ তার নিজের সন্তানের শিক্ষার অধিকারও আজ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

 

সাংবাদিক পোলাদ আসলানভের এই কারাজীবনের নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ, মর্মান্তিক ও অত্যন্ত বিতর্কিত ইতিহাস। রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর, স্পর্শকাতর ও ভয়ংকর অভিযোগে ২০১৯ সালে তাকে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার করেছিল আজারবাইজানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

একটি অত্যন্ত বিতর্কিত ও অস্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথমে তাকে দীর্ঘ ষোলো বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে দেশি-বিদেশি চাপের মুখে আপিলের মাধ্যমে সেই শাস্তির মেয়াদ কিছুটা কমিয়ে তেরো বছর করা হয়।

 

তবে পোলাদ আসলানভ শুরু থেকেই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তার বিরুদ্ধে আনা রাষ্ট্রদ্রোহের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট বলে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছেন।

 

তার নিজের এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোরালো দাবি, মূলত স্বাধীন, নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণেই তাকে এই কঠিন ও অমানবিক শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে।

 

এখন কারাগারের লৌহকপাটের ভেতর থেকে হিজাব নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তার এই আত্মত্যাগী অনশন কর্মসূচি সরকারের ওপর নতুন করে এক প্রবল নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

 

এদিকে, শিক্ষাঙ্গনে পোশাকবিধি পরিবর্তনের এই নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব কেবল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়ছে না, বরং মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরাও এর চরম ও নির্মম শিকার হচ্ছেন।

 

স্থানীয় স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম মেইদান টিভির একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে যে, রাজধানী বাকুর রিচার্ড জর্জে নামক এলাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শুধুমাত্র হিজাব পরিধান করার অপরাধে এক নারী শিক্ষিকাকে তার চাকরি থেকে সরাসরি এবং কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই বরখাস্ত করা হয়েছে।

 

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সম্মানিতা শিক্ষিকাকে কেবল তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও পোশাকের কারণে এভাবে চাকরিচ্যুত করার এই অমানবিক ঘটনা দেশের সুশীল সমাজে ও শিক্ষাঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

 

শিক্ষাঙ্গনের মতো পবিত্র জায়গায় এমন চরম অসহিষ্ণু ও বৈষম্যমূলক আচরণ দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আজারবাইজান যেখানে নারী শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে উৎসাহিত করার কথা, সেখানে পোশাকের মতো সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও স্বাধীন একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে এমন কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেরও সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

 

উদ্ভূত এই গভীর সংকট নিরসনে সরকার যদি অবিলম্বে কোনো গঠনমূলক, সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে এই সামাজিক অসন্তোষ আরও বৃহত্তর ও নিয়ন্ত্রণের বাইরের আকার ধারণ করতে পারে। এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে এক দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও সমাজ বিশ্লেষকেরা।

 

- ওসি মিডিয়া