মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধরত উভয় পক্ষ ইতোমধ্যেই একটি অভিন্ন নীতিমালার অধীনে পারস্পরিক ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ কার্যকরের ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘোষণার পরপরই কিয়েভের পক্ষ থেকে গভীর বিস্ময় এবং মস্কোর পক্ষ থেকে এক ধরনের রহস্যময় নিরবতা দেখা গেছে, যা গোটা সমঝোতার ভবিষ্যৎ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে একটি বিস্তৃত বিবৃতি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যৌথ সম্মতির ভিত্তিতে জ্বালানি খাতের ওপর আক্রমণ বন্ধের এই ঐতিহাসিক সমঝোতা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।
একই সাথে তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই এই সমঝোতার শর্ত ভঙ্গ না করে এবং চলমান ধ্বংসাত্মক হামলার ধারা থেকে নিজেদের পুরোপুরি বিরত রাখে।
ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা এবং ট্রাম্পের নিজস্ব কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে এই ঘোষণাকে সামনে আনা হলেও যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই অপ্রত্যাশিত ঘোষণার পর মস্কোর ক্রেমলিন প্রশাসন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জানায়নি। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা প্রতিরক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না আসায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, মস্কো হয়তো পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে অথবা ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ঘোষণায় কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে এসেছে একেবারেই বিপরীত প্রতিক্রিয়া। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের এই চুক্তি সংক্রান্ত দাবি সম্পর্কে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই কথিত সমঝোতা সম্পর্কে তিনি বা তার প্রশাসন পূর্বাহ্ণে কিছুই অবহিত ছিলেন না।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে এক বার্তায় বিষয়টি খোলাসা করে জানান, এমন বড় ধরনের চুক্তি কার্যকর হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তাদের হাতে পৌঁছেনি। পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরু করেছেন।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, তিনি ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন এবং আলোচনা চালিয়েছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন যে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে দফায় দফায় আলোচনা সত্ত্বেও এই চুক্তির বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাননি।
একই সঙ্গে জেলেনস্কি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ইউক্রেন সর্বদাই একটি ন্যায়সংগত যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়ার পক্ষ থেকেও এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা অপরিহার্য।
তবে বাস্তব কোনো তথ্য বা আনুষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া এমন ঘোষণাকে কার্যকর হিসেবে মেনে নেওয়া অসম্ভব। ফলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এই সমঝোতার বিশদ শর্তাবলি এবং কূটনৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার জন্য কিয়েভ গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে বলে তিনি জানান।
বিষয়টি আরও জটিল রূপ নিয়েছে কারণ চুক্তি ঘোষণার ঠিক পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনীয় নেতৃত্বকে তীব্র রাজনৈতিক ভাষায় আক্রমণ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কিয়েভের সাম্প্রতিক সামরিক কৌশল নিয়ে প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে সরাসরি সতর্কবার্তা দেন।
ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ তেল শোধনাগার এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর ইউক্রেনীয় বাহিনীর পরিচালিত আক্রমণ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এই সামরিক অভিযান আঞ্চলিক উত্তেজনাকে বিপজ্জনক স্তরে উন্নীত করছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
কূটনৈতিক সতর্কবার্তার বাইরে গিয়ে ট্রাম্প ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সরাসরি হস্তক্ষেপমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি দেশটির জনগণের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা দ্রুত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ইউক্রেনের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবর্তন ঘটায়।
ট্রাম্পের দাবি, মস্কোর সাথে একটি বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক সমঝোতায় পৌঁছানোর বেশ কয়েকটি সুবর্ণ সুযোগ জেলেনস্কি নিজের অনমনীয় মনোভাবের কারণে হাতছাড়া করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব পরিবর্তনের ব্যাপারে এমন সরাসরি বক্তব্য অত্যন্ত বিরল।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের মধ্যে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নাটকীয় অবনতিকে উন্মোচিত করেছে।
একদিকে ইউক্রেনের ওপর মস্কোর উপর্যুপরি আকাশ হামলা এবং অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার কিয়েভের রণকৌশল-উভয়ই বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হয়ে উঠেছে।
এর মাঝে আন্তর্জাতিক মিত্রদের অন্ধকারে রেখে এবং মস্কোর সমর্থন আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না করেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের একতরফা জ্বালানি যুদ্ধবিরতির দাবি সংঘাত নিরসনের বদলে বিভ্রান্তিকেই বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে ওয়াশিংটন কীভাবে এই ঘোষণার আইনি ও কূটনৈতিক ভিত্তি তুলে ধরে এবং ক্রেমলিন শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবকে কীভাবে মূল্যায়ন করে।