মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্ক চুক্তি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২০ পিএম

তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্ক চুক্তি
ছবি : Collected

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং তুরস্কের মধ্যকার ঐতিহাসিক শুল্ক চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং এর সময়োপযোগী আধুনিকায়নের জন্য আরও বিস্তর কাজ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন।

 

সম্প্রতি বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ‘ইইউ-তুরস্ক বাণিজ্য শীর্ষ সম্মেলন’-এ এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচ জোর দিয়ে বলেন যে, উভয় পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোর আধুনিকায়ন করা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তুরস্কের জন্য অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই যুগে দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে এমন সহযোগিতা কেবল বাণিজ্যই নয়, বরং কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য প্রধান তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই শুল্ক চুক্তির সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এর সমান বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

 

তিনি বলেন, “আমাদের এখনো আরও অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে।” চুক্তির আওতায় থাকা সব সদস্য দেশে এর নিরবচ্ছিন্ন প্রয়োগ নিশ্চিত করাকে তিনি একটি প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শুল্ক চুক্তি কেবল বাণিজ্য বাধাই দূর করবে না, বরং উভয় পক্ষের মধ্যে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক আদান-প্রদানকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

 

বিশেষ করে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, সেখানে তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার এই চুক্তি একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে।

 

মারোস সেফকোভিচ আরও জানান যে, শুল্ক চুক্তির আধুনিকায়নের একটি বড় অংশ হলো অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য কাঠামোর আওতা সম্প্রসারণ করা। এর মাধ্যমে উভয় অঞ্চলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে।

 

তিনি মূল্য সংযোজন শৃঙ্খল বা ভ্যালু চেইন একীভূতকরণকে একটি যৌথ কৌশলগত উদ্দেশ্য হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এই ধরনের ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত ‘স্পষ্ট ও দৃশ্যমান’ সুফল বয়ে আনবে।

 

এর ফলে শুধু যে বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে তা নয়, বরং বৃহত্তর পরিসরে বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের একীভূতকরণ প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হবে। একটি আধুনিক শুল্ক ব্যবস্থা পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে একটি শক্তিতে পরিণত করবে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় উভয় পক্ষকে সহায়তা করবে।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তুরস্কের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা এবং শক্তির ওপর আলোকপাত করে সেফকোভিচ কিছু চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তুরস্কের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ইতিমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার আর্থিক মূল্য ২১ হাজার ৭০০ কোটি ইউরোর (যা প্রায় ২৪ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের সমতুল্য) বেশি।

 

অন্যদিকে, সেবা খাতের বাণিজ্যের পরিমাণও ৪ হাজার ২০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। বাণিজ্যের এই বিশাল পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তুরস্ক একে অপরের জন্য কতটা অপরিহার্য এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার।

 

এই বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য উভয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাণিজ্য কমিশনার বলেন, “তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান এবং ঘনিষ্ঠ একজন অংশীদার।

 

আমরা এই সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্যায়ন করি, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন সমগ্র বৈশ্বিক দৃশ্যপট নানাবিধ অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ।” এর মাধ্যমে তিনি উন্মুক্ত এবং নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে যখন অনেক দেশই সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে ঝুঁকছে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তুরস্কের এই পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

 

ব্রাসেলসে আয়োজিত এই দ্বিতীয় ইইউ-তুরস্ক বাণিজ্য শীর্ষ সম্মেলনে উভয় অঞ্চলের ব্যবসা, সরকার এবং নাগরিক সমাজের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কীভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং তুরস্ক তাদের গভীর অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে একটি কৌশলগত সক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতায় রূপান্তরিত করতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা।

 

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা একমত পোষণ করেন যে, কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এই দুই অঞ্চলের মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারত্ব অত্যন্ত জরুরি।

 

পরিশেষে, তুরস্ক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার শুল্ক চুক্তির আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াটি কোনো একক পক্ষের কাজ নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং যৌথ প্রয়াস। উভয় পক্ষকেই বাণিজ্য বাধা দূরীকরণ, আইনি কাঠামোর সংস্কার এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে কাজ করে যেতে হবে।

 

ইউরোপীয় কমিশনের বাণিজ্য প্রধানের এই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্কের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও নিবিড় করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী। আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং আধুনিকায়ন উভয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

- আনাদোলু এজেন্সি