তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা আশ্বস্ত করেছেন যে, ইউরোপীয় ঋণের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। কিয়েভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় কমিশনের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। তাদের সম্ভাব্য প্রধান পরিকল্পনা হলো, ইউরোপে জব্দকৃত রুশ রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিপরীতে ১৪ হাজার কোটি ইউরোর একটি ‘ক্ষতিপূরণ ঋণ’ প্রদান করা।
তবে এই তহবিলের প্রধান জিম্মাদার প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ার এই পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোক্লিয়ারের প্রধান নির্বাহী ভ্যালেরি আরবাইন এক চিঠিতে সতর্ক করেছেন যে, এই পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মনে ‘সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ’-এর ভীতি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে সম্পদ বাজেয়াপ্ত নিষিদ্ধ হওয়ায় এটি ইউরোপীয় আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ঋণের সুদ বা খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে ইউরোনিউজ বিজনেসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একাধিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, বর্তমান প্রস্তাবটি ২০২২ সালে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দ করার মূল সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ। বিসিএ রিসার্চের গ্লোবাল ফিক্সড ইনকাম স্ট্র্যাটেজি দলের প্রধান কৌশলী রবার্ট টিম্পার মনে করেন, বাজার এতে খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখাবে না এবং সরকারের ঋণ সেবার খরচেও বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
তাঁর মতে, ২০২২ সালে যখন প্রথম সম্পদ জব্দ বা অচল করা হয়েছিল, সেটিই ছিল আসল ধাক্কা। বর্তমান পদক্ষেপের প্রভাব হবে তুলনামূলকভাবে নগণ্য। ব্রাসেলস-ভিত্তিক থিংক-ট্যাঙ্ক ‘ব্রুগেল’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো নিকোলাস ভেরনও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, সম্পদ জব্দ করার ঘটনা যখন বৈশ্বিক বাজারকে টলাতে পারেনি, তখন নতুন করে বড় কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকস তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সার্বভৌম তহবিলগুলো ইউরোপীয় বাজার থেকে সরে যাবে-এমন আশঙ্কা অতিরঞ্জিত। যদিও চীন ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো রিজার্ভ হিসেবে এখন সোনার দিকে ঝুঁকছে, তবুও পশ্চিমা আর্থিক বাজারের বাইরে বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও তরল সম্পদের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে ইউরোক্লিয়ার তাদের কাছে থাকা রুশ অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ইইউ বন্ড কিনবে। সেই বন্ড থেকে প্রাপ্ত অর্থ ইউক্রেনকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। রাশিয়া যদি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়, তবেই ইউক্রেন সেই ঋণ শোধ করবে। ইউরোপীয় কমিশন জোর দিয়ে বলছে, এটি কোনোভাবেই সরাসরি সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ নয়।
তবুও রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। মস্কো বিষয়টিকে ‘বাজেয়াপ্তকরণ’ হিসেবে প্রচার করে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ইউরোক্লিয়ারের সুরক্ষার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে কঠোর নিশ্চয়তা দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের শুরুতেই এই তহবিলের প্রয়োজন হবে।
ইউরোপীয় কমিশনার ভলদিস ডম্বভস্কিস বলেছেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা না চাপিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তার এটিই সবচেয়ে কার্যকর পথ। এখন রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপরই নির্ভর করছে বিশাল এই অর্থায়ন পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ।