সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধ প্রতিরোধ ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে ইরান সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

যুদ্ধ প্রতিরোধ ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে ইরান সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আজ সোমবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে পা রাখছেন রাশিয়ান ফেডারেশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো দুই মিত্র দেশের মধ্যে ইতোপূর্বে স্বাক্ষরিত বিশ বছর মেয়াদি ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ ট্রিটি’ বা সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির সফল ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

 

গতকাল রোববার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়েই এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক বিস্তারিত বিবৃতিতে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে রাশিয়া এবং ইরানের মধ্যে চলমান ‘আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি’ নিয়ে গভীর ও বিশদ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

 

বিশ্ব রাজনীতির এই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, দুই পরাক্রমশালী মিত্রের এই কূটনৈতিক তৎপরতা বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

 

ফরাসি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এজেন্স ফ্রান্স-প্রেস বা এএফপি-র একটি বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সের্গেই ল্যাভরভের এই অত্যন্ত নিবিড় এবং সুপরিকল্পিত সফরে তিনি ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে একান্ত এবং শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন।

 

এই বৈঠকগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে কীভাবে আরও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে বিশদ রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে। তবে ল্যাভরভ নিজে এএফপি-র সংবাদকর্মীদের কাছে এই সফরের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বৃহত্তর লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত চুক্তির সফল বাস্তবায়নের পাশাপাশি তার এই ইরান সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো ‘বড় ধরনের যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।’

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতির চরম সংকটময় এই সময়ে ল্যাভরভের এই বক্তব্য অত্যন্ত গভীর অর্থ বহন করে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাকায়েই এই সফরটিকে মূলত দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনার একটি ধারাবাহিক অংশ এবং পূর্বে গৃহীত বিভিন্ন চুক্তি বাস্তবায়নের সম্মিলিত প্রচেষ্টার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

 

এই সফরের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গত বেশ কয়েক মাস ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত সম্পূর্ণ থমকে আছে। দুই দেশের মধ্যকার এই চরম বৈরী সম্পর্ক এবং যোগাযোগহীনতা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

 

ঠিক এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে গত অক্টোবরের শুরুর দিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

 

পুতিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার এই পাহাড়সম দূরত্ব কমিয়ে আনতে এবং একটি সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক সংঘাত এড়াতে মস্কো এই দুই প্রবল প্রতিপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি সর্বজনবিদিত সত্য যে, বর্তমানে বিশ্বের যে সমস্ত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পতিত হয়েছে, সেই দেশগুলোর তালিকার একেবারে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে রাশিয়া এবং ইরান।

 

আর ঠিক এই অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে টিকে থাকার তাগিদেই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভাবনীয় মাত্রায় ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পশ্চিমা বিশ্ব যখন মস্কোকে কার্যত একঘরে করে ফেলে, তখন থেকেই তেহরান ও মস্কোর মধ্যে সামরিক, প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা এক নতুন মাত্রায় প্রবেশ করেছে।

 

পারস্পরিক সহযোগিতার এই অভাবনীয় এবং নিরবচ্ছিন্ন পথ ধরেই চলতি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ বছর মেয়াদী একটি ‘সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

এই সুদূরপ্রসারী চুক্তির আওতায় দুই দেশের মধ্যে জাতীয় প্রতিরক্ষা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি সম্পদ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং পরিবহন খাতের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর খাতগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

শুধু তাই নয়, চুক্তিটিতে আঞ্চলিক শান্তি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জটিল ইস্যুতে একে অপরের সঙ্গে আরও নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখার কথাও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকটি হলো, এটি কোনো প্রথাগত সামরিক জোট নয়।

 

কারণ, এই বিস্তৃত চুক্তিতে আক্রান্ত হলে একে অপরের প্রতিরক্ষায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, যা এই জোটটিকে অন্যান্য সামরিক জোট থেকে আলাদা করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র এক নজিরবিহীন এবং ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, গত ২৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়।

 

এই যুদ্ধের ভয়াবহতা পুরো বিশ্বকে এক গভীর অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক চাপ ও কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অত্যন্ত আলোচিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ নামক একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

 

শান্তিকামী বিশ্ববাসী এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এই শান্তির সুবাতাস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিছু অনতিক্রম্য মতবিরোধ এবং আস্থার চরম সংকটের কারণে পরবর্তীতে উভয় পক্ষই সেই বহু প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি এবং ইসলামাবাদ চুক্তি থেকে নিজেদের সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেয়, যার ফলে পরিস্থিতি আবারও চরম অবনতির দিকে ধাবিত হয়।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বাণিজ্য জলপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের বলে জোরালো দাবি করে আসছে তেহরান।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এই প্রণালির গুরুত্ব একেবারেই বর্ণনাতীত। স্বাভাবিক ও শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানিপণ্যের প্রায় বিশ শতাংশ কেবল এই একটি মাত্র সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবহন করা হয়ে থাকে।

 

যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালির নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। যেসব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অতিক্রম করার চেষ্টা করছে, সেগুলোকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ইরানের সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।

 

তেহরানের এই চরম আগ্রাসী পদক্ষেপের কঠোর এবং প্রত্যক্ষ জবাবে ওয়াশিংটনও চুপ করে বসে নেই। তারা ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশটির সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো ঘিরে নৌপথে এক অত্যন্ত কঠোর পাল্টা অবরোধ জারি রেখেছে, যা ইরানের বৈদেশিক বাণিজ্যকে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে।

 

এই সামগ্রিক এবং অত্যন্ত জটিল যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই সের্গেই ল্যাভরভের বর্তমান সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক সফরের আলোচনায় মূল এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পাবে বর্তমান সংকট নিরসনের উপায়।

 

তারা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, “ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বেআইনি ও অযৌক্তিক সামরিক হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে এক তীব্র এবং ভয়াবহ আন্তর্জাতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনের কার্যকর উপায় খুঁজে বের করাই এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মূল লক্ষ্য।”

 

ওই একই বিবৃতিতে রুশ কর্মকর্তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে একটি অত্যন্ত গুরুতর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে আরও বলেছেন যে, “বর্তমান সময়ের এই বিধ্বংসী যুদ্ধ শুধু নিকটপ্রাচ্য কিংবা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আজ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শান্তির জন্য এক মারাত্মক এবং বড় ধরনের আঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

 

সুতরাং, বিশ্ব রাজনীতির এই ভয়াবহ অচলাবস্থা নিরসনে তেহরান এবং মস্কোর এই নতুন কূটনৈতিক আলোচনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়, সমগ্র বিশ্ববাসী এখন সেদিকেই গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে।

 

- এএফপি