বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:১৮ পিএম

শিক্ষার ব্যয়বৃদ্ধি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
ছবি : Reuters

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের রাষ্ট্র আলবেনিয়ায় উচ্চশিক্ষার ক্রমাগত ব্যয়বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গভীরে শিকড় গেড়ে বসা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে দেশটির তরুণ প্রজন্ম। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে রাজধানী তিরানার রাজপথে নেমে এসেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ তরুণ।

 

বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই উত্তাল গণবিক্ষোভ দ্রুতই ধ্বংসাত্মক আকার ধারণ করে, যার ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন এবং দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় অগ্নিসংযোগের মতো চরম ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থান গ্রহণ করলে উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে বর্তমান সরকারের জন্য এটিকে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ প্রত্যাশী একটি দেশের প্রাণকেন্দ্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভের বিস্ফোরণ দেশটির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ এবং সরেজমিন তথ্যে দেখা যায়, রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে সমবেত হওয়া হাজার হাজার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী সরকারি বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে অগ্রসর হন।

 

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ নিরাপত্তা বলয় ভেঙে সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনে হামলা চালায় এবং ভবনের ভেতরে ও প্রধান ফটকে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভবনের সামনের অংশে ব্যাপক ধোঁয়া সৃষ্টি হয়।

 

ক্ষুব্ধ তরুণরা কেবল মন্ত্রণালয়ের ভবনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তারা রাজপথের পাশে থাকা বিভিন্ন আবর্জনার পাত্র উল্টে ফেলে ব্যারিকেড গড়ে তোলেন এবং সংলগ্ন বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনের অংশ ও কাচ ভেঙে তছনছ করে দেন।

 

সার্বিক পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে পুলিশ দ্রুত অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে। সহিংসতা ঠেকাতে পুলিশ বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জলকামান থেকে জল নিক্ষেপ করে এবং ক্রমাগত কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করার জোর চেষ্টা চালায়।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বর্ণনা অনুযায়ী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত কাছে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘রাইফাইজেন ব্যাংক’-এর একটি শাখাও এই নজিরবিহীন সহিংসতার শিকার হয়েছে। উত্তেজিত জনতার ছোড়া আগুনে ব্যাংকটির ওই শাখাটির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভস্মীভূত হয়।

 

পুরো এলাকায় তীব্র ধোঁয়া ও আতঙ্কের কারণে আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ নাগরিকরা দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন। ব্যাংক ও সরকারি ভবনে এমন প্রকাশ্য হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ এখন আর কেবল নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরুদ্ধে এক উন্মুক্ত বিদ্রোহের রূপ ধারণ করেছে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা ও দেশটির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ইদি রামার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটিই সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত গণআন্দোলন। গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে টানা চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন এই প্রভাবশালী নেতা।

 

তবে নির্বাচনের পর থেকেই তার সরকারের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠতে শুরু করে। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, অস্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন এবং স্বজনপ্রীতির কারণে দেশের সাধারণ জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক হতাশা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

 

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রাজপথে নেমে আসা এই তরুণ বিক্ষোভকারীরা ক্ষমতাসীন সরকারের পাশাপাশি দেশটির চিরাচরিত বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক দল ও নেতাদেরও কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে মেনে নিতে পুরোপুরি নারাজ।

 

তাদের মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিটি দলই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ফলে এটি নিছক কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা পরিবর্তনের আন্দোলন নয়, বরং সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের এক স্বতন্ত্র তরুণ অভ্যুত্থান।

 

আলবেনিয়ায় সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের এমন চরম ক্ষোভ প্রকাশের পটভূমি অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল। এর আগে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে একটি অতি বিলাসবহুল পরিবেশবিধ্বংসী অবকাশযাপন কেন্দ্র বা রিসোর্ট নির্মাণের সরকারি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ সংগঠিত হয়েছিল।

 

সাধারণ জনগণ ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ ছিল, বিদেশি বিনিয়োগের নামে দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও সৈকত ব্যক্তিগত স্বার্থে তুলে দেওয়া হচ্ছিল। তীব্র গণআন্দোলন এবং আইনি নানা জটিলতার মুখে পড়ে পরবর্তীতে সেই বিতর্কিত মেগা প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়।

 

সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার শিক্ষাক্ষেত্রের সংকট নিয়ে আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হলো আলবেনিয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বুধবারের রাজপথের সংঘর্ষ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকা শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে তাদের বক্তব্যে।

 

নিজের পরিচয় প্রকাশ না করে লরা নামের এক বিক্ষুব্ধ নারী শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব।

 

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন যে, তারা দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকারের কাছে নিজেদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া তুলে ধরেছেন, কিন্তু কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি।

 

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে করতে তারা এখন চূড়ান্তভাবে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা কোনো অবস্থাতেই রাজপথ ছেড়ে ঘরে ফিরে যাবেন না।

 

তরুণদের এই আপসহীন মনোভাব সরকারের নীতি নির্ধারকদের জন্য এক বিরাট মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে। চলমান এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও ছাত্র প্রতিনিধিরা এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের এই চরম পদক্ষেপের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।

 

তারা জানান, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ এখন অত্যন্ত করুণ ও শোচনীয় পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব, শ্রেণিকক্ষের জরাজীর্ণ অবস্থা এবং পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন না হওয়া সত্ত্বেও সরকার দফায় দফায় উচ্চশিক্ষার খরচ ও টিউশন ফি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করে চলেছে।

 

একই সাথে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি আর্থিক বৃত্তি বা শিক্ষা ঋণের চরম অভাব রয়েছে। এর চেয়েও বড় হতাশার বিষয় হলো, বছরের পর বছর ধরে কষ্ট করে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পরও দেশের অভ্যন্তরে তরুণদের জন্য কোনো সম্মানজনক ও কার্যকর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না।

 

কর্মহীনতার কারণে মেধা পাচার বাড়ছে এবং হাজার হাজার তরুণ বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ছেন। এই প্রেক্ষাপটটি কেবল আলবেনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংকট ও লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে বর্তমানে সমগ্র ইউরোপজুড়ে যে নতুন ছাত্র অসন্তোষ ও সামাজিক আন্দোলনের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছে, আলবেনিয়ার চলমান এই অস্থিরতা মূলত তারই এক অবিচ্ছেদ্য এবং তীব্রতর অংশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

হাজার হাজার শিক্ষার্থীর এমন তীব্র গণবিক্ষোভ, রাজধানীজুড়ে চরম ধ্বংসযজ্ঞ এবং দেশত্যাগের অব্যাহত দাবির মুখেও নিজের অবস্থানে অনড় থাকার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা।

 

নিজের পদত্যাগের জল্পনা সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও তাদের মনের কথা শুনতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।

 

তবে একই সাথে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মনে করিয়ে দেন, সরকারের রদবদল বা ক্ষমতা হস্তান্তর কোনো সহিংস বিপ্লবের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে না; এটি কেবল বৈধ গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব।

 

প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, মাত্র গত বছরই আলবেনিয়ার জনগণ অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের মূল্যবান ম্যান্ডেট দিয়ে বর্তমান সরকারকে চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত করেছে। কোনো অবৈধ চাপ বা রাজপথের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় আসেননি, তাই সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

 

প্রধানমন্ত্রীর এই অনমনীয় বক্তব্য এবং বিপরীতে শিক্ষার্থীদের লাগাতার লড়াইয়ের ঘোষণা আলবেনিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনকে এক রক্তক্ষয়ী ও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।

 

- রয়টার্স