ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং রাশিয়ার সারাটোভ অঞ্চলে সংঘটিত এই হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। বুধবার উভয় দেশের প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক প্রশাসন এই পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের বিষয়ে পৃথক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে পরস্পরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই পরিস্থিতিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তীব্র আকাশযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করছে, যেখানে একদিকে বেসামরিক স্থাপনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে ধ্বংসের মুখে পড়েছে জাতীয় স্তরের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ নগর সামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, রাশিয়ার অবিরাম গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শহরের তিনটি প্রধান জেলায় উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কিয়েভের দেসনিয়ানস্কি জেলার একটি বহুতল আবাসিক ভবনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। জরুরি উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় এবং ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া অন্তত ষোলজন সাধারণ নাগরিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।
তবে অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এই ঘটনায় একজন শিশুসহ অন্তত একুশজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি গোলসিয়েভস্কি জেলার একটি অনাবাসিক ভবনে আঘাত হানা হামলায় একজন নিহত এবং অপর একজন আহত হন। উদ্ধারকর্মীরা সেখানে এখনো অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো পৃথক এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, রাজধানী এবং এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের এই আক্রমণ অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ছিল। এর ফলে পুরো শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আকস্মিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
শুধু রাজধানী কিয়েভই নয়, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলেও গভীর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা বিভাগের তথ্যমতে, দেরহাচি শহরে একটি বেসামরিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গ্যারেজ প্রাঙ্গণে শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে।
সেখানে অবস্থানরত পাঁচজন সাধারণ কর্মী আহত হন। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর প্রতিরক্ষা শাখা দাবি করেছে যে, রাতভর রাশিয়া কর্তৃক নিক্ষিপ্ত মোট একশত আটাশটি আক্রমণাত্মক ড্রোনের মধ্যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একশত পনেরোটিকেই মাঝপথে সফলভাবে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ছাড়া আক্রমণকারী ঊনচল্লিশটি বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে অন্তত চারটি ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই ভয়াবহ হামলার পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক সুদীর্ঘ ও ক্ষুব্ধ বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন যে, এই আক্রমণটি ছিল পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত এবং এর ব্যাপ্তি ছিল বিশ্ববাসীকে শক্তি প্রদর্শনের এক নগ্ন রূপরেখা।
তিনি অভিযোগ করেন যে, এর আগে কখনো মস্কো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এমন প্রকাশ্য অবজ্ঞা ও অসম্মান প্রদর্শন করেনি। রাশিয়া প্রকৃতপক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধানের দেওয়া শান্তি সংক্রান্ত সতর্কবার্তা বা বক্তব্যকে সামান্যতম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে না বলেই এমন আঘাত হানতে পেরেছে।
জেলেনস্কি জানান, এই হামলায় ইউক্রেনের জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ছাব্বিশটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং তেল ও গ্যাস খাতের আরও চারটি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশজুড়ে বর্তমানে অন্তত ছয় লাখের বেশি নিরীহ মানুষ সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অন্ধকারের মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংকট মোকাবিলায় তিনি রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান এবং ইউক্রেনের আকাশ সুরক্ষায় দ্রুত অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করার জন্য পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি জোর দাবি জানান।
পাল্টা দাবিতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা কিয়েভ এবং খারকিভ অঞ্চলের যোগাযোগ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এই আক্রমণ চালিয়েছে। রাশিয়ার ভাষ্যমতে, এই নির্দিষ্ট স্থাপনাগুলো ইউক্রেনের সামরিক শিল্প খাতকে সচল রাখতে এবং সম্মুখসারির সৈন্যদের সহায়তা জোগাতে পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
তাই মস্কো কেবল বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হেনেছে। এর পাশাপাশি মস্কো আরও একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের ছোড়া নয়শত দুটি চালকবিহীন আত্মঘাতী ড্রোন রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী সফলভাবে ধ্বংস করেছে।
রাশিয়ার মোট উনিশটি অভ্যন্তরীণ অঞ্চল, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আজভ সাগর এবং ২০১৪ সালে মস্কোর অন্তর্ভুক্ত হওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপের আকাশসীমায় এই সুবিশাল প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।
মস্কো শহরের মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন এক বিবৃতিতে দাবি করেন যে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রাজধানী মস্কোর দিকে ধেয়ে আসা অন্তত চারশত তিরানব্বইটি ইউক্রেনীয় ড্রোন তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাঝপথেই ধ্বংস করে দিয়েছে।
এর মধ্যে অন্তত একশত আশিটি ড্রোন সরাসরি রাজধানীর আকাশসীমায় প্রবেশ করার মুখে বাধাগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সারাটোভ অঞ্চলের গভর্নর রোমান বুসারগিন জানিয়েছেন, বালাকোভো শহরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যবশত সেখানে একজন সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে গভর্নর দাবি করেন যে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সত্ত্বেও শহরের অন্যান্য সাধারণ জনসেবা ও অবকাঠামোগুলো স্বাভাবিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় তাৎক্ষণিক জরুরি দপ্তর স্থাপন করা হয়েছে।
রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এসবের ব্যাংকের প্রথম উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলেকজান্ডার ভেদ্যাকিন নিশ্চিত করেছেন যে, বালাকোভোতে অবস্থিত তাদের একটি বৃহৎ তথ্যপ্রযুক্তি ডেটা সেন্টারেও এই ড্রোন আঘাত হেনেছিল, তবে ব্যাংকের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা সম্পূর্ণ সচল ও নিরাপদ রয়েছে।
চলমান যুদ্ধপরিস্থিতির চরম বাস্তবতায় মস্কো এবং কিয়েভ উভয়ের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এসব সামরিক দাবির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় পক্ষই পরস্পরের প্রধান লজিস্টিক সেন্টার, সামুদ্রিক বন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য নিজেদের দূরপাল্লার আক্রমণ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
উভয় দেশই বেসামরিক নাগরিকদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু বানানোর বিষয়টি জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের দাবি, পরিচালিত সকল আক্রমণ কেবলমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তু বা সামরিক তৎপরতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত স্থাপনাগুলোর ওপরই নিবদ্ধ রাখা হয়েছে।
এই নতুন দফা সংঘাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে, কারণ মাত্র কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ঘোষণায় জানিয়েছিলেন যে, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ অবিলম্বে বন্ধ করার বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি অনানুষ্ঠানিক অস্ত্রবিরতি নীতিতে সম্মত হতে যাচ্ছে।
মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও ইতিপূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে হামলা চালানো চিরতরে বন্ধ করে, তবে ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আক্রমণ চালানো থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত।
তবে যেকোনো ধরনের উত্তেজনাহীনতা অবশ্যই পারস্পরিক পদক্ষেপ এবং কঠোর আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে বলে তিনি পরিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই প্রস্তাবের বিষয়ে অবিলম্বে কোনো সুস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া না জানালেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন এবং ব্যাপক মাত্রার হামলা শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে পুনরায় গভীর অনিশ্চয়তা ও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।