সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালিতে ভয়াবহ বিক্ষোভ, আহত ১৪১ পুলিশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

ইতালিতে ভয়াবহ বিক্ষোভ, আহত ১৪১ পুলিশ
ছবি: AA

ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্সে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও গণবিক্ষোভের রেশ এবার আছড়ে পড়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইতালিতে। জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চরম মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে ইতালির বিভিন্ন শহরে তীব্র বিক্ষোভ ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।

 

সাধারণ নাগরিকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সপ্তাহান্তে এক অগ্নিগর্ভ রূপ ধারণ করে। শনিবার শুরু হওয়া এই গণবিক্ষোভের এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক ও ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে দেশজুড়ে অন্তত ১৪১ জন পুলিশ সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে রোববার পর্যন্ত দেশব্যাপী ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ, যেখানে কেবল এক দিনেই ১৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন থেকে ইতালির এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ইতালিতে বেশ কিছুদিন ধরেই সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন যখন চরম সংকটের মুখে, ঠিক তখনই ‘ইতালিয়া ইন পিয়াজ্জা’ বা ‘চত্বরে ইতালি’ নামক ব্যানারের অধীনে দেশের বিভিন্ন শহরের রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ।

 

ইতালির স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর মিলানে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ এই বিক্ষোভে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এছাড়া তুরিন শহরে তিন হাজার, ঐতিহাসিক শহর বোলোনিয়ায় দুই হাজার, বেরগামোতে আটশো এবং ব্রেসিয়া শহরে অন্তত ছয়শো সাধারণ নাগরিক রাজপথে নেমে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্লোগান দিতে থাকেন।

 

প্রাথমিক পর্যায়ে এই জমায়েতগুলোর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা সরকারের শীর্ষ মহলে পৌঁছে দেওয়া হলেও, ধীরে ধীরে তা চরম সহিংসতায় রূপ নেয় এবং রাজপথ রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

 

বিক্ষোভের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং ধ্বংসাত্মক রূপ দেখা গেছে ইতালির অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত মিলান শহরে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের একটি বিশাল অংশ আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে তীব্র আক্রমণ শুরু করে।

 

পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান লক্ষ্য করে আন্দোলনকারীরা বৃষ্টির মতো পাথর, কাঁচের বোতল এবং আতশবাজি নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে যখন বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় ব্যারিকেড স্থাপন করে পুলিশের অগ্রগতি রুখে দেওয়ার চেষ্টা করে।

 

পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে দাঙ্গা পুলিশ চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। উন্মত্ত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ব্যাপকভাবে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

 

এই চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটে, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মাঝে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এই সংঘাতের সময় ইতালির বিশেষায়িত সামরিক পুলিশ বাহিনী ‘কারাবিনিয়েরি’-এর একটি টহল গাড়িতেও বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়।

 

ইতালির খুচরা বিক্রেতাদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন ‘কনফেকমারচিও’-এর বরাত দিয়ে দেশটির জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম স্কাই টিজি২৪ জানিয়েছে, সপ্তাহান্তের এই মাত্র দুই দিনের সংঘাতে মিলানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটে অন্তত পাঁচ লাখ ইউরোর বেশি আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। কেবল মিলান শহরেই সংঘাত ও লুটপাটে সরাসরি জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে প্রশাসন।

 

মিলানের পাশাপাশি ইতালির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের তুমুল খণ্ডযুদ্ধের খবর পাওয়া গেছে। তুরিন শহরে বিক্ষোভ চলাকালে সরকারি কাজে সরাসরি বাধা প্রদান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অভিযোগে এক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিক্ষোভে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের ব্যাপক এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশগ্রহণ। তুরিনেই পেট্রলবোমা বহন করা এবং তা ব্যবহারের প্রস্তুতির অভিযোগে তিন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ, যা প্রশাসনকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

অন্যদিকে বোলোনিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের কাছেও পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানেও বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথর ও কাঁচের বোতল ছুড়তে থাকে এবং রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করে।

 

এই রেলস্টেশন এলাকার সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ককে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বোলোনিয়ার পরিস্থিতি সামাল দিতেও পুলিশকে বাধ্য হয়ে কাঁদানে গ্যাস এবং জলকামানের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়।

 

সার্বিকভাবে পুরো ইতালিতে এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রশাসন যে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যানে। স্কাই টিজি২৪-এর সম্প্রচারিত সংবাদ ও তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, শনিবার বিক্ষোভের প্রথম দিনে যখন রাজপথে ব্যাপক সহিংসতা, পুলিশের সরকারি কর্তব্যে বলপ্রয়োগ করে বাধা প্রদান এবং রাষ্ট্রীয় ও জনগণের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

 

অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রথম দিন গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জনই ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক, যা থেকে এটি স্পষ্ট যে অর্থনৈতিক হতাশা কেবল বয়স্কদেরই নয়, বরং দেশের তরুণ ও কিশোর সমাজকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

 

পরদিন রোববার বিক্ষোভ যখন আরও তীব্র ও দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়, তখন পুলিশের ধরপাকড় অভিযান আরও জোরদার করা হয়। এদিন দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে পুলিশ একযোগে আরও ১৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করে।

 

আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্য থেকে ৪৩ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং বাকিদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

 

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা এবং সংঘাতের পর ইতালির শীর্ষ রাজনৈতিক মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাদের প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 

একই সঙ্গে তিনি রাজপথে ঘটা সব ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড এবং সহিংসতার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের নামে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদে আঘাত হানা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি, দলমত নির্বিশেষে দেশের সব বিরোধী রাজনৈতিক দলকে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে নিন্দা জানানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

 

তবে একজন রাষ্ট্রনায়কসুলভ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে তিনি এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, রাজপথে নেমে আসা হাজার হাজার মানুষ কেবল সহিংসতায় লিপ্ত হননি, বরং তাদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা এবং ন্যায্য দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

অন্যদিকে, ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিক্ষোভ মোকাবিলায় আইনি কাঠামো পরিবর্তনের একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তার রাজনৈতিক দল ‘লিগ’ খুব শিগগিরই পার্লামেন্টে একটি নতুন আইনের প্রস্তাব পুনরায় উত্থাপন করবে।

 

এই প্রস্তাবিত আইনে এমন একটি বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে, যেখানে এই ধরনের বিশাল ও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ বিক্ষোভের আয়োজকদের আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে, যাতে বিক্ষোভ থেকে কোনো সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে সেই জমানো অর্থ দিয়ে তার ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব হয়।

 

জাতীয় নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি ইতালির বিভিন্ন শহরের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির বিষয়ে নিজেদের কঠোর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। মিলান শহরের মেয়র জিউসেপ্পে সালা সাধারণ মানুষের হতাশা ও ক্ষোভের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করলেও সব ধরনের সহিংসতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

 

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার যৌক্তিক কারণ অনুধাবন করা সম্ভব। কিন্তু সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দিনরাত পরিশ্রম করা পুলিশের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালানো এবং শহরের মহামূল্যবান সম্পদ ধ্বংস করার কোনো নৈতিক বা আইনি গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না।

 

একইভাবে বোলোনিয়া শহরের মেয়র মাত্তেও লেপোরেও তার নিজ শহরে ঘটা সব ধরনের সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে উদ্দেশ্য করে তিনি একটি আবেগময় বার্তা প্রদান করেছেন।

 

তিনি দেশের যুব সমাজকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়ে বিক্ষোভের নামে যারা সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটে জড়িত, তাদের থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

 

আনাদোলু এজেন্সির মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর সার্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইতালির এই চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সমগ্র ইউরোপের জন্যই একটি সুনির্দিষ্ট সতর্কবার্তা। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তি নিশ্চিত করা না গেলে যেকোনো মুহূর্তেই যে এমন সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে, ইতালির এই রাজপথের লড়াই বিশ্ব রাজনীতির সামনে সেই অমোঘ সত্যকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি