ফরাসি সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দেশ থেকে আসা পেনশনভোগীদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা বা চিকিৎসা সুবিধা বন্ধ করার এক কঠোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর ফলে ফ্রান্সের উদার সমাজসেবামূলক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিদেশীদের ‘বিনা খরচে’ চিকিৎসা পাওয়ার দিন কার্যত ফুরিয়ে আসছে।
এতদিন ধরে ফ্রান্সে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, দেশটিতে মাত্র ৯০ দিন বা তিন মাস বৈধভাবে বসবাসের পর থেকেই বিদেশী পেনশনভোগীরা ফরাসি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতেন। এই আইনি সুযোগ বা ‘লুপহোল’ ব্যবহার করে বহু প্রবাসী, যারা ফ্রান্সের নাগরিক নন এবং সেদেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী অবদান রাখেননি, তারাও বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা ভোগ করে আসছিলেন।
তবে ফরাসি সরকার এখন এই আইনি ফাঁকফোকর চিরতরে বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। নতুন প্রস্তাবিত আইনের মূল লক্ষ্য হলো, যারা ইইউ-এর নাগরিক নন, তাদের জন্য এই রাষ্ট্রীয় অনুদানমূলক সুবিধা বাতিল করা। এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বেন যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ফ্রান্সে প্রায় দেড় লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক বসবাস করছেন।
ব্রেক্সিটের পর থেকে ব্রিটেনে বসবাসরত নাগরিকদের সংখ্যাও প্রায় একই রকম। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বীমা বা নিজস্ব তহবিলের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অনেকের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হতে পারে। প্রস্তাবিত আইনটি ইতিমধ্যেই ফরাসি পার্লামেন্টে বড় ব্যবধানে প্রাথমিক অনুমোদন লাভ করেছে।
গত মাসে অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে এই কঠোর প্রস্তাবের পক্ষে ১৭৬টি ভোট পড়ে, যেখানে বিপক্ষে ছিল মাত্র ৭৯টি ভোট। আইন প্রণেতাদের এই বিপুল সমর্থন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী বছরের মধ্যেই এটি চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হবে এবং দ্রুততম সময়ে কার্যকর করা হবে। ফরাসি সরকারের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা দেখছেন দেশটির অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া এবং নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার প্রয়াস হিসেবে।
যারা ভবিষ্যতে ফ্রান্সে অবসর জীবন কাটানোর পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের জন্য এই বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট-বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ আর থাকছে না। আর যারা বর্তমানে এই সুবিধা ভোগ করছেন, তাদের জন্যও ভবিষ্যৎ হয়ে উঠছে অনিশ্চিত। একসময়ের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী অবসর যাপনের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত ফ্রান্স তার দরজা কিছুটা সংকুচিত করছে। ফলে বিদেশী প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার রোদ এখন আর আগের মতো উষ্ণতা ছড়াবে না, বরং তা হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চ্যালেঞ্জিং।