মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২০, ২০২৬
৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাদ পড়লো খুলনা টাইগার্সের বর্তমান স্বত্বাধিকারীও

আর এন এস স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৫, ০৩:৩১ পিএম

বাদ পড়লো খুলনা টাইগার্সের বর্তমান স্বত্বাধিকারীও
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর আসন্ন আসরকে সামনে রেখে দলগুলোর মালিকানা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পদক্ষেপ নিলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের পরবর্তী আসরগুলোর জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি বা দলের স্বত্বাধিকারী হতে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহপত্র (ইওআই) জমা দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই এবং কঠোর মূল্যায়ন শেষে এর মধ্য থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

 

অযোগ্য ঘোষিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুটি নাম বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর একটি হলো 'বাংলা মার্ক লিমিটেড', যারা নোয়াখালী অঞ্চলের নামে একটি নতুন দল গঠনের আগ্রহ দেখিয়েছিল। অন্যটি হলো 'মাইন্ড ট্রি', যারা বিপিএলের প্রতিষ্ঠিত দল খুলনা টাইগার্সের বর্তমান স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিপিএলে নোয়াখালীর অন্তর্ভুক্তির স্বপ্ন যেমন থমকে গেল, তেমনি খুলনা টাইগার্সকেও খুঁজতে হবে নতুন মালিক।

 

বিপিএলের গভর্নিং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতেই এবারের বাছাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোরভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। বিসিবির এই পদক্ষেপকে টুর্নামেন্টের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর একটি জোরালো প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বিপিএলের অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, একাধিকবার বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির আর্থিক অসংগতি, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বকেয়া রাখা এবং টুর্নামেন্টের মাঝপথে মালিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা টুর্নামেন্টের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছে। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বিসিবি এবার আগেভাগে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে।

 

আসন্ন আসরগুলোর জন্য দল গোছাতে গত সেপ্টেম্বরে আগ্রহপত্র আহ্বান করে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান সাড়া দেয়। এরপরই শুরু হয় দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিসিবির আইন বিভাগ, একটি স্বতন্ত্র আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান (লিগ্যাল কনসালটেন্সি ফার্ম) এবং একটি সনদপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক প্রতিষ্ঠান (চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ফার্ম) প্রতিটি আবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে। এই ত্রিস্তর বিশিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং খেলাধুলার প্রতি তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির মূল্যায়ন করা।

 

রবিবার এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানান বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু। তিনি বলেন, "মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা ৮টিতে নামিয়ে এনেছি। আমাদের চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট কোম্পানি ব্যাপারটা হচ্ছে, আগ্রহপত্রে আমরা অনেক ধরনের ডকুমেন্ট (নথিপত্র) চেয়েছিলাম। এই তিনটি কোম্পানির সেইসব ডকুমেন্টের ঘাটতি ছিল, যার ফলে তারা কোয়ালিফাই করতে পারেনি বা যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।"

 

তিনি আরও যোগ করেন, "প্রাথমিক যাচাই-বাছাই এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের আইন বিভাগ, আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ফার্ম ১১টি অংশগ্রহণকারীর নথি পর্যালোচনা করেছে। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রক্রিয়ার শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।"

 

বাদ পড়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে দুটি নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তা হলো-মাইন্ড ট্রি ও বাংলা মার্ক। 'মাইন্ড ট্রি ও রূপসী কনক্রিট লিমিটেড কনসোর্টিয়াম' বিপিএলে খুলনা টাইগার্স দলের বর্তমান স্বত্বাধিকারী। একটি প্রতিষ্ঠিত এবং টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী দলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের এভাবে নথিপত্রের ঘাটতির কারণে বাদ পড়াটা একরকম বিস্ময়কর।

 

যদিও ঠিক কী ধরনের নথিপত্রের ঘাটতি ছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে, বিসিবির নির্ধারিত কঠোর আর্থিক মানদণ্ড, যেমন-ব্যাংক গ্যারান্টি বা দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনার প্রমাণ দাখিলেই হয়তো তারা ব্যর্থ হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে খুলনা টাইগার্স দলটি এখন মালিকানাহীন হয়ে পড়লো।

 

তবে, যেহেতু ৮টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, ধারণা করা হচ্ছে, এই ৮টির মধ্যে কোনো একটি নতুন প্রতিষ্ঠান খুলনার স্বত্বাধিকার গ্রহণ করবে, অথবা বিসিবি এই ৮টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়েই দলগুলোর স্লট নতুনভাবে সাজাবে।

 

দ্বিতীয় বড় ধাক্কাটি লেগেছে নোয়াখালীর ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য। 'বাংলা মার্ক লিমিটেড' নামের প্রতিষ্ঠানটি নোয়াখালী অঞ্চলের নামে একটি দল নিয়ে বিপিএলে প্রবেশের আবেদন করেছিল। বিপিএলের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ এর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট বা বরিশালের মতো নোয়াখালীর অন্তর্ভুক্তিও টুর্নামেন্টে নতুন মাত্রা যোগ করতো বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু নথিপত্রের ঘাটতিতে বাংলা মার্কের আবেদনটি অযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় নোয়াখালীবাসীর সেই স্বপ্ন আপাতত অপূর্ণই থাকছে।

 

বাদ পড়া তৃতীয় প্রতিষ্ঠানটি হলো 'এসকিউ স্পোর্টস এন্টারপ্রাইজ'। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের এই কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া যে কেবল শেষ ধাপেই হয়েছে তা নয়, বরং শুরু থেকেই বেশ কড়া মনোভাব দেখিয়েছে বিসিবি। মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহপত্র জমা দিলেও, গত বৃহস্পতিবার আলোচনার জন্য মাত্র ৯টি প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

 

আমন্ত্রণ না পাওয়া দুটি প্রতিষ্ঠান ছিল 'চিটাগং কিংস' এবং নতুন আবেদনকারী 'দেশ ট্রাভেলস'। 'চিটাগং কিংস' নামটি বিপিএলের পুরোনো একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির কথা মনে করিয়ে দেয়, যাদের সাথে বিসিবির পূর্বের কোনো অমীমাংসিত আর্থিক বা আইনি জটিলতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে আলোচনার টেবিলেই না ডাকার মাধ্যমে বিসিবি কার্যত শুরুতেই তাদের অযোগ্য ঘোষণা করে।

 

পরবর্তীতে, যে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়, সেখান থেকেই আজ (রবিবার) এসকিউ স্পোর্টস, বাংলা মার্ক এবং মাইন্ড ট্রি কনসোর্টিয়ামকে বাদ দেওয়ার খবর এলো। বিপিএলের সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু জানিয়েছেন, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপটি সম্পন্ন হবে আগামী ৪ঠা নভেম্বর (মঙ্গলবার)।

 

তিনি বলেন, "চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন, আইন বিভাগ, আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ফার্ম কর্তৃক যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর, যোগ্য ইউআই অংশগ্রহণকারীর (আগ্রহপত্র জমাদানকারী) চূড়ান্ত তালিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী ৪ তারিখে ঘোষণা করা হবে।"

 

এই তালিকার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, বিপিএলের আসন্ন আসরে কোন আটটি প্রতিষ্ঠান দল পরিচালনার দায়িত্ব পাচ্ছে। এই আটটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণার পরই জানা যাবে খুলনা টাইগার্সের নতুন স্বত্বাধিকারী কারা হচ্ছে, নাকি নতুন কোনো নামে নতুন কোনো দল বিপিএলে যুক্ত হচ্ছে।

 

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, বিসিবি এবার বিপিএলের পেশাদারিত্ব এবং আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো আপস করতে রাজি নয়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে টুর্নামেন্টের ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপিএলের জন্যই সুফল বয়ে আনবে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।