বিস্ময়করভাবে, কেবল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, স্বয়ং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন উগ্র ডানপন্থি জোটের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও এই যুদ্ধবিরতির উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করছেন।
তাদের অভিযোগ, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি দাহিয়াহসহ লেবাননের অন্যান্য অঞ্চলে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করে নেতানিয়াহু একপ্রকার শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করছেন। জোটের অনেক শীর্ষ নেতাই প্রধানমন্ত্রীর এই সম্ভাব্য নমনীয় সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
তারা মনে করছেন, এটি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি বয়ে আনবে। ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
তিনি লেবাননের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে আক্ষরিক অর্থেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন। প্রায় একই ধরনের যুদ্ধংদেহী ও চরমপন্থি সুর শোনা গেছে দেশটির কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের কণ্ঠেও।
এই দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর এমন প্রকাশ্য ও তীব্র বিরোধিতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, নেতানিয়াহুর নিজস্ব রাজনৈতিক বলয়ের ভেতরেই বড় ধরনের মতানৈক্য ও ফাটল তৈরি হয়েছে, যা তার সরকারের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণে এই রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি রাজনীতিকদের এমন প্রকাশ্য দূরত্ব বজায় রাখার মূল কারণ হলো আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচন।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিগত দিনগুলোতে দেশের জনগণকে যেসব সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তবে তার সিংহভাগই তিনি পূরণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।
এখন সেই ব্যর্থতাকে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং নিজ জোটের অন্যান্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনীতিকরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার কৌশল গ্রহণ করেছেন।
তারা যুদ্ধবিরতির এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে নেতানিয়াহুর একটি বিশাল ‘কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে ইসরায়েলি জনগণের সামনে জোরালোভাবে উপস্থাপন করছেন।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিরোধীরা এবং তার জোটের শরিকরা বর্তমানে দেশজুড়ে এই প্রচারণায় সোচ্চার হয়েছেন যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
তারা আরও দাবি করছেন, সবচেয়ে বড় মিত্র মার্কিন প্রশাসনের কাছেও নেতানিয়াহুর আগের মতো কোনো জোরালো প্রভাব বা গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট নেই। এই সামগ্রিক দুর্বল পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আসন্ন নির্বাচনে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সব পক্ষ।
তবে, পরিস্থিতি এখানেই শেষ হচ্ছে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, নেতানিয়াহু অত্যন্ত চতুর রাজনীতিক এবং তিনি হয়তো তার পুরোনো ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক কৌশল আবারও ব্যবহার করতে পারেন।
নিজের ক্ষমতা যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে এবং আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে আরও পিছিয়ে দেওয়ার সুকৌশলী উদ্দেশ্যে তিনি হয়তো হঠাৎ করে লেবাননে বড় আকারের কোনো ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালাতে পারেন, অথবা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো গভীর আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারেন।