অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই চুক্তিটিকে সরাসরি ‘আমেরিকার পরাজয়ের ঘোষণা’ বলে কঠোর ভাষায় অভিহিত করেছে ইরান সরকার। ইরানের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং এই অত্যন্ত সংবেদনশীল চুক্তির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
বুধবার স্বনামধন্য ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-এর প্রকাশিত এক বিস্তৃত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা হয়। দশকের পর দশক ধরে চলা বৈরী সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার পর এই চূড়ান্ত চুক্তিটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে একটি অভাবনীয় ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জোরালোভাবে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের অত্যন্ত সফল, নিরপেক্ষ ও কার্যকর মধ্যস্থতায় সম্প্রতি চূড়ান্ত হওয়া এই যুগান্তকারী চুক্তির অন্তর্নিহিত মূল বিষয়বস্তুর দিকে ইঙ্গিত করে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের রাষ্ট্রীয় অবস্থান পরিষ্কার করেন।
তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে জোর দিয়ে বলেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পাওয়া এই চুক্তিটি কোনোভাবেই বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ বা কোনো বৃহৎ শক্তির সামরিক জবরদস্তির কাছে নতিস্বীকার করার ফল নয়।
বরং এই বিরল কূটনৈতিক অর্জনটিকে তিনি অদম্য ও সাহসী ইরানি জাতির দীর্ঘস্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধ, ইস্পাতকঠিন জাতীয় মনোবল এবং আঞ্চলিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বিশ্বমঞ্চে নিজেদের এই অভাবনীয় কূটনৈতিক সাফল্য তুলে ধরতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ইরানিদের এই স্বাধীন ও আপসহীন মানসিকতার কারণেই শেষ পর্যন্ত বহুকাঙ্ক্ষিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি পরাশক্তি আমেরিকার চরম পরাজয়ের একটি ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে।
শুধু চুক্তির প্রশংসাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে ইরানের নিজস্ব কৌশলগত রূপরেখা তুলে ধরে গালিবাফ একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কঠোর বার্তা প্রদান করেছেন।
তাঁর সুচিন্তিত মতে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সার্বিক দায়িত্ব কেবল এই অঞ্চলের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর হাতেই ন্যস্ত থাকা উচিত, কোনোভাবেই কোনো পশ্চিমা বা বহিরাগত পরাশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।
রাষ্ট্রীয় কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের পবিত্র মাটি থেকে সব ধরনের বিদেশি সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সেনাদের সম্পূর্ণ ও শর্তহীন প্রত্যাহারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করছে ইরান সরকার।
এই দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে গালিবাফ বলেন যে, বিদেশি এই সামরিক শক্তিগুলো দশকের পর দশক ধরে এই অঞ্চলে কেবল টেকসই শান্তি ও নিরাপত্তা তৈরি করতেই চরমভাবে ব্যর্থ হয়নি, বরং তারাই প্রকৃতপক্ষে এই অঞ্চলের সমস্ত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সশস্ত্র সংঘাত, চরমপন্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার প্রধান ও আদি উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে।
বুধবার আজারবাইজানের মনোরম রাজধানী বাকুতে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতিনির্ধারণী ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
তাঁর এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী ভাষণটি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি ও সম্প্রসারিতভাবে সম্প্রচার করা হয়, যা একই সঙ্গে দেশের আপামর জনসাধারণ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বার্তা পৌঁছে দেয়।
এই প্রসঙ্গের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জড়িত রয়েছে। উল্লেখ্য যে, কৌশলগত ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দেশেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত সুবিশাল সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চলমান এই ভয়াবহ যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা ইরানের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে চালানো ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বোমা হামলার সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবে, যেসব প্রতিবেশী দেশে এই পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিগুলো পরিচালিত হচ্ছিল।
সেগুলোই স্বাভাবিকভাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা সামরিক হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এর প্রত্যক্ষ ফলে পুরো অঞ্চল জুড়েই এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল।
ভবিষ্যতে এই সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি বজায় রাখার রূপরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করতে গিয়ে গালিবাফ সামরিক সংঘাতের বদলে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নিজের গভীর আস্থা ও বিশ্বাস জ্ঞাপন করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দায়িত্বশীলতার সাথে উল্লেখ করেন যে, ইরান এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে কোনোভাবেই নিরবচ্ছিন্ন ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, রক্তপাত বা ধ্বংসের আয়নায় বিচার করে না; বরং পারস্পরিক গঠনমূলক মিথস্ক্রিয়া, একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি অটুট সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমেই একটি স্থিতিশীল, উন্নত ও সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য গড়ার স্বপ্ন দেখে তেহরান।
একই সঙ্গে, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত, নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র লেবাননের সার্বিক পরিস্থিতিও যে ঠিক কতটা সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটি তিনি অত্যন্ত অকপটে ও সাহসিকতার সাথে স্বীকার করেন।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক চুক্তির অন্যতম একটি প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে লেবাননে নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি ও পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রতিষ্ঠাকে শুরু থেকেই জুড়ে দিয়েছিল ইরান। গালিবাফ তাঁর দীর্ঘ ও সারগর্ভ বক্তব্যের একেবারে উপসংহারে অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, তেহরানের কাছে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়াটা ঠিক ততটাই পরম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল খোদ ইরানের নিজেদের ভূখণ্ডে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা।
বৃহত্তর আঞ্চলিক ঐক্যের স্বার্থে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেবাননে চলমান আগ্রাসী যুদ্ধের অবসান ঘটানোকে ইরানের নিজস্ব যুদ্ধের অবসান ঘটানোর মতোই সমান, সমান্তরাল ও অবিচ্ছেদ্য রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে বিবেচনা করেছে তেহরান প্রশাসন।