বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার কড়া ঘোষণা ইসরায়েলের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম

মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার না করার কড়া ঘোষণা ইসরায়েলের
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ইসরায়েল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের প্রধান মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যতই প্রবল কূটনৈতিক চাপ আসুক না কেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে কোনো অবস্থাতেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এবং ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের বরাতে প্রকাশিত এই সংবাদটি বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, দৌত্য ও মধ্যস্থতার কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর চালানো ব্যাপক আগ্রাসন, স্থল অভিযান ও তীব্র বিমান হামলার কারণে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ও বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংঘাতপূর্ণ ওই এলাকা থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া এই অসহায় মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি। এই বিশাল মানবিক সংকটের বিষয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ অত্যন্ত রূঢ় ও কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই দুই লাখ বাস্তুচ্যুত লেবানিজ নাগরিককে কোনোভাবেই তাদের নিজেদের বাসভূমিতে পুনরায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না।

 

তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং মানবিক ত্রাণ সরবরাহকারী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি অঞ্চলে সামরিক শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে এত বিপুল সংখ্যক নিরীহ মানুষকে স্থায়ীভাবে নিজ মাতৃভূমিতে ফেরার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জেনেভা কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশ্লেষক ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মাঝে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।

 

ইসরায়েলের এমন অনমনীয়, একগুঁয়ে ও কঠোর অবস্থানের পেছনের যুক্তি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরতে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ অতীতের কিছু তিক্ত ও সংঘাতময় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

 

তিনি দাবি করেন যে, অতীতে যখন দক্ষিণ লেবাননের তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ বেসামরিক লোকজনকে স্বাধীনভাবে বসবাস ও যাতায়াতের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তখন সেই মানবিক সুযোগের চরম অপব্যবহার করে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর অসংখ্যবার প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়েছিল।

 

ওই সামরিক অভিযানগুলোতে রাস্তার পাশে লুকিয়ে পুঁতে রাখা শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ এবং অতর্কিত সশস্ত্র গেরিলা আক্রমণের কারণে ইসরায়েলি বাহিনীকে চরম মানবিক ও কৌশলগত মূল্য চোকাতে হয়েছিল।

 

অতীত ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত স্মৃতিচারণ করে কাটজ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইসরায়েল আর কোনোভাবেই নিজেদের সৈন্যদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই পুরোনো ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে দেবে না।

 

মূলত নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা সুসংহত করতে এবং সম্মুখসারিতে থাকা সেনাদের প্রাণহানি ঠেকাতেই তারা এই কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই প্রকাশ্য ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অকৃত্রিম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একধরনের নীরব অথচ গভীর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টিও এখন দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা, সংঘাতের বিস্তার রোধ এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বারবার ইসরায়েলকে তাদের সামরিক আগ্রাসন কমিয়ে আনা এবং বেসামরিক মানুষের জানমালের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

কিন্তু ইসরায়েলি শীর্ষ পর্যায়ের এই সর্বশেষ বিবৃতি প্রমাণ করে যে, নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামরিক স্বার্থের প্রশ্নে তারা এখন মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চাপও অনায়াসে উপেক্ষা করতে প্রস্তুত। এই জটিল পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

 

সার্বিকভাবে, দক্ষিণ লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের এই কঠোর ও অটল সামরিক নীতি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাস্তুচ্যুত দুই লাখ মানুষের চরম মানবিক সংকট এবং ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতির কারণে সাধারণ লেবানিজদের জীবনে নেমে আসা সীমাহীন দুর্দশা আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থা এই মানবিক বিপর্যয় রোধে এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে ক্রমাগত আহ্বান জানিয়ে গেলেও, ইসরায়েলের এই সামরিক উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।

 

সামনের দিনগুলোতে লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই অনড় অবস্থান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর ঠিক কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ধাবিত করবে কি না, তা নিয়ে শান্তিকামী বিশ্বনেতাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

 

- আল জাজিরা