তাঁর বিশ্লেষণী মতে, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরান এবং তাদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ বা এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স চরম দুর্বল হয়ে পড়ার পর আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়াবে সুন্নি মতাদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো।
বিশেষ করে, আগামী পনেরো বছরের মধ্যে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিশরের সঙ্গে ইসরায়েলের একটি সর্বাত্মক ও সরাসরি যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বলে তিনি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
একই সঙ্গে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করেছেন, মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতা শেষ পর্যন্ত মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো প্রবল রাজনৈতিক শক্তির হাতেই চলে যাবে, যা ওই অঞ্চলের সামগ্রিক শক্তির ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে।
সম্প্রতি জেরুজালেমে আয়োজিত ‘জিউইশ নিউজ সিন্ডিকেট’ বা জেএনএস আন্তর্জাতিক নীতি শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে হেরুত সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিয়াদ কোহেন এই সুদূরপ্রসারী মন্তব্য করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কৌশলগত নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে আয়োজিত ওই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় কোহেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, শিয়া শক্তির পরিবর্তে এখন তুরস্ক ও মিশরের মতো সুন্নি রাজনৈতিক বলয়ের দিকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বকে অনেক বেশি সতর্ক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
তিনি সম্মেলনে উপস্থিত আন্তর্জাতিক অতিথি ও নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আজ থেকে ঠিক পনেরো বছর পর ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে এক অনিবার্য সামরিক সংঘাত বা যুদ্ধ সংঘটিত হবে এবং অদূর ভবিষ্যতেই কায়রোর শাসনভার মুসলিম ব্রাদারহুড নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হবে।
আমিয়াদ কোহেন তাঁর দীর্ঘ ও সতর্কতামূলক বিশ্লেষণী বক্তব্যে মুসলিম ব্রাদারহুডকে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার জন্যই নয়, বরং সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন, এই মতাদর্শিক রাজনৈতিক সংগঠনটি বর্তমানে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
তাঁর মতে, ফ্লোরিডা এবং টেক্সাসের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোতেও সংগঠনটি অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক নীরব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
এমনকি নিউইয়র্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির বিজয়ের নেপথ্যেও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রচ্ছন্ন ও শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত প্রদান করেন।
যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, নিজের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর দাবির পক্ষে কোহেন সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট বা বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ওই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপন করতে সক্ষম হননি।
মিশরের পাশাপাশি আধুনিক তুরস্ককেও ভবিষ্যৎ ইসরায়েলের জন্য একটি অত্যন্ত বড় ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন এই প্রখ্যাত জায়নবাদী নেতা। তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক নীতিগত বক্তব্যের উদাহরণ টেনে কোহেন দাবি করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আঙ্কারার যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও বিস্তার ঘটছে, সেটিকে তেল আবিবের অত্যন্ত গভীর সতর্কতা ও উদ্বেগের সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত।
তাঁর এই বক্তব্য মূলত ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গড়ে ওঠা এক নতুন চিন্তাধারারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এই নতুন কৌশলগত চিন্তাধারায়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একক আধিপত্য বা প্রভাব কমে যাওয়ার পর ভবিষ্যতে তুরস্ক ও মিশরের মতো বৃহৎ সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোকেই ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা মহলে এই ধরনের ভবিষ্যৎ শঙ্কা প্রকাশ এটাই প্রথম নয়। মাত্র গত মাসেই ইসরায়েলের হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ও অত্যন্ত আলোচিত সাবেক গুপ্তচর জোনাথন পোলার্ড প্রায় অভিন্ন একটি ভূ-রাজনৈতিক শঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলেন।
তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক রাজনীতিতে তেহরানের সামরিক দাপট হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক তুরস্ক এবং প্রতিবেশী মিশরই হতে যাচ্ছে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধান ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী।
পোলার্ড অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরে নিজের একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন এবং তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে ও সুপরিকল্পিতভাবে ধীরে ধীরে ইরানের শূন্যস্থানটি দখল করে নিচ্ছেন।
পোলার্ডও তাঁর বিস্তৃত আলোচনায় ভবিষ্যৎ বিপদের তালিকায় সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী মিশরের নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন, যদিও দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি আনুষ্ঠানিক, লিখিত এবং এখন পর্যন্ত কার্যকর শান্তিচুক্তি বিদ্যমান রয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ১৯৭৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় মিশর ও ইসরায়েলের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তির পর থেকে বিগত দশকগুলোতে দুই দেশ তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতা বজায় রেখে চলেছে।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা, জেরুজালেমের পবিত্র স্থানসমূহ এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চরম উত্থান-পতন ও তীব্র উত্তেজনা লক্ষ করা গেছে।
এসব ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আমিয়াদ কোহেন তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য প্রধান আঘাত কোনো শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে আসবে না, বরং এই চ্যালেঞ্জ আসবে শক্তিশালী সুন্নি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং উদীয়মান আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর দিক থেকে।
এই অত্যন্ত রূঢ় ও কঠিন বাস্তবতার মোকাবিলায় ইসরায়েলকে এখনই সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রধান মিত্রের অবস্থান সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি পরিশেষে বলেন, এই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলকে যেমন সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী হতে হবে, তেমনি আমেরিকাকেও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের হারানো শক্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে।
কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে।