মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পারমাণবিক চুক্তির শর্তে ইরানের ১২০০ কোটি ডলারের তহবিল অবমুক্ত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ০১:২০ পিএম

পারমাণবিক চুক্তির শর্তে ইরানের ১২০০ কোটি ডলারের তহবিল অবমুক্ত
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর এক অভাবনীয় কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে আংশিকভাবে তেল ও জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

একই সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ইরানের প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি বা ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের অবরুদ্ধ তহবিলও শর্তসাপেক্ষে অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন।

 

ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে এই যুগান্তকারী চুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম। বৈরী সম্পর্কের এই বরফ গলার ঘটনাকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।

 

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ বা অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার ঘোষণা প্রদান করেছে। ওয়াশিংটনের এই ঘোষণার ফলে ইরান আগামী পহেলা আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অপরিশোধিত তেল এবং পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পাবে।

 

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে টানা ১৮ ঘণ্টার এক ম্যারাথন ও নিবিড় আলোচনার পর দুই দেশ এই চূড়ান্ত সমঝোতায় উপনীত হয়। এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

 

মার্কিন আলোচকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান তাদের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে বেশ কিছু গঠনমূলক প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে।

 

বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে অবাধ প্রবেশ ও পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার পরই মূলত ওয়াশিংটন এই বিশাল অঙ্কের তহবিল অবমুক্ত করার এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

তবে এই সাফল্যের খবরের পরপরই তহবিল ব্যবহারের শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ ও বিপরীতমুখী বক্তব্য সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমঝোতার পরপরই এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে, ইরানের অবমুক্ত করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে উৎপাদিত পণ্য, বিশেষ করে কৃষিজাত সামগ্রী কেনার কাজেই ব্যবহার করতে হবে।

 

কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন কৃষিপণ্য বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট পণ্য কেনার বিষয়ে চুক্তিতে তাদের কোনো প্রকার আইনি বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই।

 

অবমুক্ত করা এই নিজস্ব তহবিল ইরান তাদের জাতীয় ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে যেকোনো খাতে ব্যয় করার পূর্ণ অধিকার রাখে বলে ইরানের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন।

 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো চিরশত্রু হিসেবে পরিচিত একটি দেশের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার বিষয়ে খোদ ইরানের অভ্যন্তরেই গভীর রাজনৈতিক বিতর্ক ও তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।

 

দেশটির কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহল ও অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু পক্ষ ইরানি প্রতিনিধি দলের এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে। তবে সমালোচকদের এই নেতিবাচক মন্তব্যের অত্যন্ত কড়া ও আবেগঘন জবাব দিয়েছেন প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

 

তিনি দেশের সাধারণ নাগরিক ও সমালোচকদের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন এবং নিরীহ মানুষের রক্তপাত যেকোনো মূল্যে বন্ধ করার এক মহান উদ্দেশ্য নিয়েই মূলত তাঁদের প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছিল।

 

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি-তে প্রচারিত একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় গালিবাফ নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, টেলিভিশনের ওই অনুষ্ঠানে অনেকেই এমন মন্তব্য করেছেন যে, মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যদি জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হতো, তবে এই আলোচক দল কখনোই সুইজারল্যান্ডে পৌঁছাতে পারত না।

 

সমালোচকদের জবাব দিতে গিয়ে গালিবাফ এক্স পোস্টে লেখেন, প্রতিনিধি দল সুইজারল্যান্ডে না গেলে প্রতি মুহূর্তে লেবাননের মুসলিম ও শিয়াদের আরও বেশি রক্ত ঝরত। মূলত বৃহত্তর মানবিক স্বার্থ রক্ষা ও আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই ইরান এই কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

 

অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তিকে ওয়াশিংটনের একটি বিশাল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করেছে। ভ্যান্স বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, দীর্ঘ কয়েক বছরের অচলাবস্থা ও কঠোর গোপনীয়তার পর ইরান প্রথমবারের মতো তাদের দেশে জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় মাইলফলক।

 

পরিশেষে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেন, ইরান যেন ভবিষ্যতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, তা সুনিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র এই পরিদর্শন ব্যবস্থাকে আরও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী করার সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 

- মিডল ইস্ট আই ও নিউজ অ্যারেনা ইন্ডিয়া