মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬
৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শর্ত অমান্য করলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

শর্ত অমান্য করলে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প
ছবি : Collected

সাম্প্রতিক সময়ে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির শর্তসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরানকে চূড়ান্ত ও অত্যন্ত কঠোর বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

 

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তেহরান প্রশাসন যদি এই বহুল আলোচিত চুক্তির কোনো একটি ধারা বা শর্ত সামান্যতমও অমান্য করার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় যেকোনো ধরনের কঠোর আইনি, অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণে মার্কিন প্রশাসন বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।

 

আন্তর্জাতিক মহলের গভীর মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা এই চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান যে অত্যন্ত দৃঢ় এবং আপসহীন, তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

 

একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ছাড়করণের পর তা ঠিক কোন খাতে এবং কী প্রক্রিয়ায় ব্যয় করা হবে, সে বিষয়েও হোয়াইট হাউসের সুস্পষ্ট ও কঠোর রূপরেখা তুলে ধরেছেন তিনি।

 

গত সোমবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি এবং কড়া ভাষায় তার প্রশাসনের অবস্থান ব্যক্ত করেন।

 

তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, ইরান যদি সম্পাদিত চুক্তির শর্তাবলি অনুযায়ী নিজেদের পরিচালনা না করে অথবা তারা যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাশিত ঠিকঠাক আচরণ প্রদর্শন না করে, তবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় যা কিছু করার প্রয়োজন হবে, তিনি ঠিক তাই করবেন।

 

তার এই অত্যন্ত কড়া সতর্কবার্তা থেকে এটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, চুক্তির মাঠপর্যায়ের সফল ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন এখন তেহরানের প্রতিটি সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের ওপর অত্যন্ত নিবিড় এবং সূক্ষ্ম নজরদারি বজায় রাখছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই কড়া বিবৃতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানকে চুক্তির প্রতি আস্থাশীল থাকতে এক প্রকার শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে।

 

উল্লেখ্য যে, বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন এবং অপ্রত্যাশিত মাত্রা যোগ করে মাত্র এক সপ্তাহ আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এক ঐতিহাসিক ও বিশেষ অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন।

 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন তোলা এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি এমন এক চরম উত্তেজনাকর এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে সম্পন্ন হয়েছে, যার ঠিক তিন মাস আগে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক ভয়ংকর সামরিক সংঘাতের সাক্ষী হয়েছিল।

 

ওই রক্তক্ষয়ী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও সামরিক স্থাপনার ওপর একযোগে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালিয়েছিল।

 

ওই ভয়াবহ হামলার জবাবে ইরানও মোটেও নিশ্চুপ থাকেনি; বরং তারা অত্যন্ত জোরালো ও আক্রমণাত্মকভাবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশের ওপর পাল্টা বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন হামলা চালায়।

 

দুই পক্ষের মধ্যে চলা এই দীর্ঘ, উদ্বেগজনক ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের বিশেষ ও নিরলস কূটনৈতিক তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত এই কাঙ্ক্ষিত শান্তি চুক্তিটি আলোর মুখ দেখে।

 

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির সংবেদনশীল অর্থনৈতিক দিকগুলো নিয়েও অত্যন্ত বিস্তারিত কথা বলেন।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের যেসব অবরুদ্ধ বিপুল পরিমাণ অর্থের ওপর থেকে এখন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হচ্ছে, চুক্তির অত্যন্ত কঠোর শর্ত অনুযায়ী সেই অর্থগুলো কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কৃষিজাত খাদ্যসামগ্রী কেনার মতো জরুরি মানবিক কাজেই ব্যবহার করা যাবে, কোনো সামরিক খাতে নয়।

 

নিজের এই কৌশলগত অর্থনৈতিক অবস্থানের সপক্ষে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি উল্লেখ করেন যে, ওই অবমুক্ত করা অর্থ শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্য কেনার মাধ্যমেই আবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ফিরে আসবে।

 

তার ভাষ্যমতে, ইরানের সাধারণ ও খেটে খাওয়া জনগণের এই মুহূর্তে খাদ্যের চরম ও তীব্র প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের বসবাস, কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে পর্যাপ্ত খাবার খাওয়াতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

 

ফলে যুক্তরাষ্ট্র যে বিশাল অঙ্কের অর্থ ছাড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা পরিশেষে মার্কিন কৃষকদের পকেটেই ফিরে যাবে বলে তিনি অত্যন্ত জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

এই দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক সংঘাত শুধু দুটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এক গভীর ও মর্মান্তিক মানবিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

ইরানের মাটিতে যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক বড় ধরনের নির্বিচার স্থল ও আকাশ অভিযানের কারণে পুরো অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার নিরীহ সাধারণ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।

 

একই সঙ্গে লাখ লাখ অসহায় নারী, শিশু ও বয়স্ক নাগরিক নিজেদের ভিটামাটি ও আদি ঘরবাড়ি হারিয়ে চিরতরে বাস্তুচ্যুত হয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। যুদ্ধের এই ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও চরমভাবে আঘাত হেনেছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার ফলে অশোধিত তেলের মূল্যে বড় ধরনের অস্থিরতা এবং আকস্মিক আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যা সামলাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

 

- এনডিটিভি