মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের আটকে থাকা সম্পদ যদি কোনো পর্যায়ে ছাড় করা হয়, তবে তা একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হতে হবে।
এই প্রক্রিয়ার মূল ও অনস্বীকার্য শর্ত হলো, ছাড়কৃত অর্থের সম্পূর্ণ অংশ কেবল ইরানের সাধারণ জনগণের মানবিক কল্যাণে ও জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই অর্থ সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি বা কোনো ধরনের সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।
সোমবার, ২২ জুন কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের এই তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই বৈরী অচলাবস্থা নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের এই বার্তাকে একটি যুগান্তকারী ও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জব্দকৃত অর্থ ছাড়ের এই জটিল প্রক্রিয়ার রূপরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন যে, এই বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে একটি চমৎকার ও বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা হয়েছে।
এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন সাবেক মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা জ্যারেড কুশনার। এই নতুন ও যুগান্তকারী নীতিমালার আওতায়, ইরানের কোনো অর্থ ছাড় করতে হলে তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং কাতার-উভয় দেশেরই আনুষ্ঠানিক ও যৌথ অনুমোদনের একান্ত প্রয়োজন হবে।
এই দ্বৈত অনুমোদনের পর, ছাড়কৃত সেই অর্থ সরাসরি ইরানের সরকারি কোষাগারে তুলে না দিয়ে, তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে ইরানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পুষ্টির চাহিদার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভুট্টা ও গম ক্রয় করা হবে।
এই অভিনব পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে যেমন সাধারণ ইরানিদের চরম মানবিক সংকট মোকাবিলার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করা হবে, ঠিক তেমনি এই অর্থ যেন কোনোভাবেই ভুল খাতে প্রবাহিত না হয়, সেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগও সম্পূর্ণভাবে প্রশমিত হবে।
অর্থনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি পারমাণবিক চুক্তির শর্তাবলি পালনের বিষয়েও এই দীর্ঘ আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। জেডি ভ্যান্স অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিশ্চিত করেছেন যে, চুক্তির প্রাথমিক শর্তগুলো ইরান যথাযথভাবে ও সততার সঙ্গে মেনে চলছে কি না, তা অত্যন্ত নিবিড় ও স্বাধীনভাবে তদারকি করার জন্য আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অভিজ্ঞ পরিদর্শকরা আবারও ইরানে ফিরে যেতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।
তিনি এই পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, উভয় দেশ একটি চূড়ান্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথে ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। আলোচনায় যে অভাবনীয় ও গঠনমূলক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা বৈশ্বিক শান্তির স্বার্থে অবশ্যই উদযাপনের দাবি রাখে।
তবে এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর আলোচনার পথটি মোটেই মসৃণ ছিল না। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, মতানৈক্যের জেরে আলোচনার একপর্যায়ে ইরানি প্রতিনিধিদল চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াকআউট বা আলোচনা কক্ষ চিরতরে ত্যাগ করার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা অত্যন্ত ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক পেশাদারিত্বের অনন্য পরিচয় দিয়ে গভীর রাত একটা পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন। বর্তমানে মার্কিন কারিগরি দলের সুযোগ্য সদস্যরা সুইজারল্যান্ডের বারগেনস্টকে ইরানি কারিগরি দলের সঙ্গে অবশিষ্ট অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক পরিণতির আগে আলোচনার শুরুর দিকের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাকর ও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনার একেবারে প্রাক্কালে তেহরান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়ার কঠোর ও ভয়ংকর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল।
এর ঠিক বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বও চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ইরানের ওপর নতুন করে বিধ্বংসী সামরিক হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছিল। তবে সব ধরনের বাগ্যুদ্ধ, রাজনৈতিক বৈরিতা ও সামরিক উত্তেজনাকে সফলভাবে পাশ কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত কূটনীতিরই চূড়ান্ত জয় হয়েছে।
এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী দুটি রাষ্ট্র কাতার ও পাকিস্তানের এক যৌথ বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আগামী ষাট দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট পথনকশা বা রোডম্যাপে চূড়ান্তভাবে সম্মত হয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব প্রকাশনায় নিশ্চিত করেছে যে, সুইজারল্যান্ডের নৈসর্গিক বুর্গেনস্টক রিসোর্টে চলতি সপ্তাহজুড়ে কারিগরি পর্যায়ের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ফলাফলমুখী আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
এর পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আরও দুটি বড় ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষ লেবাননে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধের বিষয়ে একমত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করতে একটি সরাসরি ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা বা হটলাইন চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা সংঘাতময় মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ও সম্ভাবনাময় যুগের সূচনা করতে পারে।