দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিবিড় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রায় ১৮ ঘণ্টার এক ম্যারাথন বৈঠক শেষে ইরানের উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ প্রতিনিধি দলটি সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক ত্যাগ করে তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ এই আলোচনার ইতিবাচক সমাপ্তিকে বিশ্বশান্তির পক্ষে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই পুরো আলোচনা প্রক্রিয়ায় মূল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী দুই রাষ্ট্র কাতার এবং পাকিস্তান এই বৈঠককে অত্যন্ত ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে অভিহিত করেছে।
একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি বিরোধের একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের লক্ষ্যে উভয় পক্ষ বেশ কিছু নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং আগামী দুই মাসের একটি সুনির্দিষ্ট পথনকশা বা রোডম্যাপ তৈরিতে পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন সংলগ্ন বার্গেনস্টকে অনুষ্ঠিত এই দীর্ঘ ও নিবিড় আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
ঐতিহাসিক এই কূটনৈতিক মিশনে ইরানের পক্ষে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি দলটিতে ছিলেন দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়কমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মাতি, উপ-জ্বালানি ও তেলমন্ত্রী হামিদ বুর্দ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত অভিজ্ঞ হিসেবে পরিচিত পারমাণবিক বিষয়ের প্রধান আলোচক আলী বাকরি।
প্রতিনিধি দলের এমন বহুমুখী গঠন থেকে এটি স্পষ্ট যে, এই সংলাপে কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়নই নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল বাণিজ্য সচল করা এবং পরমাণু চুক্তির মতো অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও সমভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইএসএনএ এবং তাসনিমের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, মূল রাজনৈতিক নেতৃত্ব তেহরানের উদ্দেশে রওয়ানা দিলেও ইরানের একটি বিশেষ কারিগরি দল এখনও সুইজারল্যান্ডেই অবস্থান করছে।
দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই কারিগরি দলটি সেখানে অবস্থান করে পূর্বনির্ধারিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ বা এমওইউ-এর বিভিন্ন ধারা ও উপধারা নিয়ে মার্কিন কারিগরি দলটির সঙ্গে বিস্তারিত ও সূক্ষ্ম আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি তাদের নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনে নিশ্চিত করেছে যে, লেক লুসার্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে বার্গেনস্টক থেকে গালিবাফের নেতৃত্বাধীন মূল প্রতিনিধি দলটির বিদায়ের পর কারিগরি পর্যায়ের এই আলোচনাকে আরও গতিশীল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার যৌথভাবে জানিয়েছে, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার এই আলোচনা অত্যন্ত আন্তরিক, স্বস্তিদায়ক ও ফলপ্রসূ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বরফ গলার এক উৎসাহব্যঞ্জক কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
আলোচনা থেকে অর্জিত বাস্তব অগ্রগতি হিসেবে মধ্যস্থতাকারী দেশ দুটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তির দিকে প্রক্রিয়াটিকে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নিতে ওয়াশিংটন এবং তেহরান কয়েকটি নতুন ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থারণে একমত হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সম্পূর্ণ কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটিকে রাজনৈতিকভাবে তদারকি ও দেখভাল করার জন্য একটি অতি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি গঠন করা হচ্ছে।
এছাড়া চুক্তির প্রতিটি জটিল ও কারিগরি শর্তগুলো মাঠপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে তা বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশেষ কারিগরি কর্মীদল বা ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষ একটি কঠোর সময়সীমা বা রোডম্যাপ নির্ধারণ করেছে, যা আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণে অত্যন্ত নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ডের এই নিবিড় আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
যদিও চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে, তবুও দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই মুখোমুখি সংলাপ নতুন করে কোনো সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিকে অনেকাংশে কমিয়ে এনেছে।
অমীমাংসিত ও জটিল বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকেই দুই দেশের কারিগরি দলগুলোর মধ্যে পরবর্তী ধাপের নিবিড় আলোচনা অব্যাহত থাকার কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর নীতি অনুসরণ করে এই সংলাপকে বৈশ্বিক কূটনীতির একটি অন্যতম সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করতে পারে।