সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংলাপে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকৃত কূটনৈতিক অগ্রগতি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংলাপে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকৃত কূটনৈতিক অগ্রগতি
ছবি : Collected

সুইজারল্যান্ডের অত্যন্ত সুরক্ষিত পরিবেশে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এই সংলাপে দুই দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক করমর্দন কিংবা যৌথ আলোকচিত্র গ্রহণের মতো প্রতীকী দৃশ্য দেখা যায়নি।

 

এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনেক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক সমালোচনা করলেও, দৃশ্যমান আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে পর্দার অন্তরালে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।

 

দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে দুই দেশের নীতিনির্ধারকরা সরাসরি মুখোমুখি টেবিলে বসেছেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।

 

এই নিবিড় সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং একটি টেকসই সমঝোতার পথ উন্মোচন করা।

 

বৈঠকটি শুরু হওয়ার আগের মুহূর্তগুলোতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ক্যামেরাগুলো অত্যন্ত ব্যস্ত ছিল। সেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবশালী জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে গভীর আলোচনায় লিপ্ত থাকতে দেখা যায়।

 

অন্যদিকে, একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে করমর্দন করেন এবং সংক্ষিপ্ত দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময় করেন।

 

তবে পুরো প্রক্রিয়ায় যা সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তা হলো, মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদলের কোনো সদস্যকেই ক্যামেরার সামনে একে অপরের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় কিংবা সরাসরি কোনো কথা বলতে দেখা যায়নি।

 

অথচ বৈঠকটি শুরু হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় ব্যাপক গুঞ্জন ছিল যে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মধ্যে হয়তো একটি ঐতিহাসিক করমর্দন হতে যাচ্ছে।

 

কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ইরানি প্রতিনিধিদল এই ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রচারণামূলক ফটোশুটে অংশ নিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 

তেহরানের প্রধান আলোচক ও শীর্ষ কর্মকর্তারা এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাঝেই একটি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে তারা এই সংলাপে অংশ নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তারা এখনো তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবেই বিবেচনা করেন।

 

ইরানি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ববর্তী নীতি ও নির্দেশের কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্য করে অতীতে বিভিন্ন সময়ে নানামুখী পদক্ষেপ ও হামলা চালানো হয়েছিল।

 

এর পাশাপাশি তারা এমন কিছু ধ্বংসাত্মক বিমান হামলার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন, যার ফলে একটি সাধারণ বিদ্যালয়ে বহু নিরপরাধ শিশু প্রাণ হারিয়েছিল এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

 

অতীতের এই তিক্ত ও সংঘাতময় স্মৃতিগুলো দুই দেশের মধ্যকার আলোচনার টেবিলে এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। নিজেদের এই ঐতিহাসিক অবস্থান এবং ক্ষোভকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ইরানি প্রতিনিধিদল একটি বিশেষ প্রতীকী নাম ব্যবহার করেছে। তারা নিজেদের ‘মিনাব ১৬৮’ নামে অভিহিত করেছে।

 

এই নামটি মূলত ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো বিমান হামলায় নির্মমভাবে নিহত হওয়া ১৬৮ জন নিরীহ শিক্ষার্থীর স্মরণে উৎসর্গ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব সম্প্রদায়কে এটি স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে যে, যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতার পেছনে তাদের এই বিশাল মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বেদনা জড়িয়ে রয়েছে।

 

তবে এই ধরনের তীব্র আবেগ ও প্রতীকী অনীহা সত্ত্বেও, আলোচনার মূল টেবিলে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর কিছু অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে, যা বিশ্বশান্তির জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

 

আনুষ্ঠানিক করমর্দনের অভাবকে ছাপিয়ে এই দীর্ঘ সংলাপের পর উভয় পক্ষ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, আলোচনা থেকে আসা সিদ্ধান্ত ও সমঝোতাগুলো মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে একটি দক্ষ কারিগরি কর্মদল গঠন করা হয়েছে।

 

এর চেয়েও বড় স্বস্তির বিষয় হলো, এই স্পর্শকাতর আলোচনার সমান্তরালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ রয়েছে।

 

এই সবকটি পদক্ষেপই ইঙ্গিত করে যে, দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক চ্যানেলটি অত্যন্ত সক্রিয় এবং ধীরগতিতে হলেও আলোচনা একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত কোনো চুক্তির ফলাফল এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংলাপের পথ যত দীর্ঘ এবং জটিলই হোক না কেন, একটি বিষয় ইতোমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার একটি অদৃশ্য ক্ষেত্র তৈরি হলেও, তা কখনোই কোনো ঐতিহাসিক করমর্দন বা বিজয়ের হাসিমুখে তোলা ছবির মাধ্যমে উদযাপিত হবে না।

 

মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর নানামুখী প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, এই দুই দেশের মধ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি কোনো প্রকাশ্য প্রচারণার মাধ্যমে নয়, বরং পর্দার আড়ালের নীরব ও দূরদর্শী কূটনীতির পথ ধরেই এগিয়ে যাবে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নীরব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই হয়তো ভবিষ্যতে বড় কোনো সংঘাত এড়ানোর একমাত্র চাবিকাঠি হতে যাচ্ছে।

 

- সিএনএন