সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শান্তি প্রতিষ্ঠায় চরমপন্থি ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ নীতি বাতিলের আন্তর্জাতিক আহ্বান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬, ০১:২৮ পিএম

শান্তি প্রতিষ্ঠায় চরমপন্থি ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ নীতি বাতিলের আন্তর্জাতিক আহ্বান
ছবি : Collected

গত ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। এ চুক্তির অধীনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং লেবাননে সামরিক আগ্রাসন বন্ধের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

 

শতাধিক দিন ধরে চলা এ ভয়াবহ সংঘাতে ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে হলে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা বৃহত্তর ইসরায়েল নামক চরমপন্থি নীতি থেকে সরে আসা অত্যন্ত জরুরি।

 

‘গ্রেটার ইসরায়েল’ মূলত নির্দিষ্ট কোনো সীমানা নয়, বরং এটি একটি আধিপত্যবাদী ধারণা। এই আগ্রাসী মতবাদের কারণেই গাজা, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক ও সবশেষ ইরানে একের পর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা হয়েছে।

 

এ নীতি অনুসারে, জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কিছু অংশ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি প্রকাশ্যে এ ধারণাকে সমর্থন করেছেন।

 

এই মতবাদের মূল চালিকাশক্তি দুটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠী। একদিকে নেতানিয়াহুর মতো কট্টরপন্থিরা, যারা নিরাপত্তার অজুহাতে সমগ্র ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান এবং সেখানে বসবাসরত আশি লাখ ফিলিস্তিনির অধিকার সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন।

 

অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো আধিপত্যবাদীরা মনে করেন, ঈশ্বর এই সম্পূর্ণ ভূখণ্ড কেবল ইহুদিদেরই দিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে স্মোট্রিচ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, গাজা, পশ্চিম তীর বা লেবানন থেকে ইসরায়েল কোনোভাবেই সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করবে না।

 

কয়েক দশক আগেই এই মতবাদ আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়া উচিত ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থাকা জায়নবাদীদের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু এটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আগ্রাসন ছিল এই কাল্পনিক ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণারই সর্বশেষ বাস্তবায়ন।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও দেশটিকে পদানত করা সম্ভব হয়নি। উল্টো হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেয়।

 

এর আগে সিরিয়াতেও প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন-ইসরায়েলি প্রচেষ্টা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল, যা দেশটিকে স্রেফ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নীতির কারণে আর্থসামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ইরানের সাথে নতুন চুক্তির মাধ্যমে তিনি সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন।

 

ঠিক এ কারণেই ইসরায়েলের চরমপন্থি নেতারা চুক্তিটি নস্যাৎ করতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছেন, যার ফলে শুক্র ও শনিবার যথাক্রমে ৪৭ ও ৩২ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

 

বাস্তবতা হলো, এই আগ্রাসী নীতি ইসরায়েলকে সুরক্ষিত করার বদলে বিশ্বদরবারে তাদের ভাবমূর্তি ধসিয়ে দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের ৬ জনই ইসরায়েলকে অপছন্দ করেন।

 

পশ্চিম এশিয়ায় প্রকৃত শান্তি ফেরানোর একমাত্র পথ হলো ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ নীতির চূড়ান্ত অবসান। এর জন্য গাজায় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ ও পশ্চিম তীরে আগ্রাসন থামানো অপরিহার্য।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে জাতিসংঘের ১৯৪তম সদস্য হিসেবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে এবং লেবানন ও সিরিয়া থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আরব বিশ্ব ও ইরানকে এই বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সুস্পষ্ট করতে হবে যে, এই আগ্রাসী নীতি ত্যাগ করাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একমাত্র পথ।

 

- আল জাজিরা