কোনো কারণে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তেহরান এখনো শত্রুদের অত্যন্ত শক্ত জবাব দিতে সম্পূর্ণ সক্ষম। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী এই দেশটির প্রতিরক্ষা কাঠামো কোনো নির্দিষ্ট ঘাঁটি বা একক স্থানের ওপর নির্ভরশীল নয়।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তাদের গোপন ও ব্যাপক বিস্তৃত প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর কারণে এই সক্ষমতাকে রাতারাতি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার চিন্তা একেবারেই অবাস্তব। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোও এখন এই রূঢ় বাস্তবতা মেনে নিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি নির্মূল করার মার্কিন সামরিক মিশনের ব্যর্থতায় গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পুনর্গঠন করে ফেলেছে।
বর্তমানে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলে তারা প্রায় পূর্ণমাত্রায় পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। এমন এক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি মূলত প্রচারযুদ্ধের একটি অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প মূলত এ ধরনের বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে গণমাধ্যম ও তার রাজনৈতিক সমর্থকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীর সামনে এমন একটি ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে, তেহরানের আর পাল্টা জবাব দেওয়ার কোনো ক্ষমতা অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান এখনো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ রাষ্ট্র এবং কৌশলগত প্রতিরোধ বা ডেটারেন্সের ক্ষেত্রে এই সামরিক সক্ষমতা তাদের জন্য অপরিহার্য।
এর আগে আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের টানা চল্লিশ দিনের বোমাবর্ষণের পরও ইরান অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বোমাবিদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর প্রায় সত্তর শতাংশই পুরোপুরি সারিয়ে তুলেছে।
নতুন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিএনএন স্বীকার করে নিয়েছে যে, তেহরান আবারও তাদের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছে।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কৌশল ছিল পাহাড়ের গভীরে থাকা এসব ঘাঁটির সুড়ঙ্গপথের প্রবেশমুখে বোমাবর্ষণ করে তা অকার্যকর করা, যাকে তারা এখন একটি সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখছে।
কারণ ইরান ধীরে ধীরে এই কৌশলকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হ্যাগসেথও এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, ইরান অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠছে এবং সক্ষমতার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত উন্নত মার্কিন অস্ত্রগুলোর ঘাটতি পূরণ করে নিজেদের ভাণ্ডার পুনরায় সমৃদ্ধ করতে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেরই তিন থেকে ছয় বছর সময় লেগে যেতে পারে।
ইরানকে ঘিরে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের একক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও এখন বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিবিসির ফার্সি সার্ভিসের সাংবাদিক সিয়াভাশ আর্দালান এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কট্টর রিপাবলিকান রাজনীতিকও এখন প্রকাশ্যে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার থাকা উচিত বলে মন্তব্য করছেন।
অতীতে আত্মরক্ষার এই অধিকার কেবল ইসরায়েলের জন্যই প্রয়োগ করা হতো, ইরানের ক্ষেত্রে তা অস্বীকার করা হতো। বৈশ্বিক এই সমীকরণ পরিবর্তনের যুগে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সামর্থ্যের একেবারেই বাইরে, তা আজ প্রমাণিত সত্য।
সামরিক শক্তির এই ক্রমবর্ধমান উত্থান ইরানকে কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণেও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।