যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বা ট্রেজারি বিভাগের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সাধারণ লাইসেন্স বা ছাড়পত্র জারি করা হয়েছে। এই সাময়িক নির্দেশনার আওতায় আগামী ২১শে আগস্ট পর্যন্ত বৈশ্বিক বাজারে ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম এবং পেট্রোকেমিক্যাল জাতীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রয় সম্পূর্ণরূপে বৈধ বলে বিবেচিত হবে।
সোমবার, ২২শে জুন কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মার্কিন প্রশাসনের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপকে একটি অভাবনীয় ও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি বা রাজস্বমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতিতে এই অভাবনীয় পদক্ষেপের পেছনের প্রেক্ষাপট ও কারণগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন যে, নিরপেক্ষ রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলমান অত্যন্ত নিবিড়, দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনার একটি সফল ফলস্বরূপ এই ইতিবাচক সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে।
এই ম্যারাথন দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সবচেয়ে বড় ও স্বস্তিদায়ক সাফল্য হলো, ইরান বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক শর্ত সম্পূর্ণ বিনা দ্বিধায় মেনে নিতে সম্মত হয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ও কৌশলগত শর্ত হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান, ব্যস্ততম ও সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বিশ্বের সকল দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ, নিরাপদ ও সম্পূর্ণ বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও রপ্তানিকৃত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ নিয়মিতভাবে এই অত্যন্ত সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়ে থাকে, ফলে এর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য।
এর পাশাপাশি, তেহরান তাদের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি পুনরায় কঠোর আন্তর্জাতিক তদারকি ও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অভিজ্ঞ পরিদর্শকদের পুনরায় নিজেদের সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বাধাহীনভাবে প্রবেশের এবং স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অনুমতি প্রদান করতেও আনুষ্ঠানিকভাবে ও লিখিতভাবে সম্মত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বিশ্বকে একটি অধিকতর নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধশালী বাসযোগ্য স্থানে পরিণত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।
মূলত, তাঁদের সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক চাপ এবং একই সঙ্গে আলোচনার দরজা উন্মুক্ত রাখার দ্বিমুখী নীতির কারণেই তেহরান শেষ পর্যন্ত নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছে এবং একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে পা বাড়িয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর এই ধরনের সরাসরি সমঝোতা বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সমঝোতা চুক্তিটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উভয় দেশের কারিগরি দলগুলোর মধ্যে প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক বৈঠক অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এই প্রাথমিক চুক্তির শর্তগুলো উভয় পক্ষ, বিশেষ করে ইরান, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ও সততার সঙ্গে পালন করছে কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে ওয়াশিংটন।
আর এই কূটনৈতিক সমঝোতা ও পারস্পরিক সদিচ্ছার প্রাথমিক স্বীকৃতি হিসেবেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ মূলত ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই ষাট দিনের সাময়িক সাধারণ ছাড়পত্র বা লাইসেন্সটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করেছে।
এর ফলে দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি সাময়িকভাবে হলেও কিছুটা শ্বাস ফেলার ও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
তবে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় জল্পনাকল্পনা ও প্রশ্ন হলো, আগামী ২১শে আগস্ট এই নির্দিষ্ট ষাট দিনের সাময়িক লাইসেন্সের মেয়াদ চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী কৌশল বা পদক্ষেপ ঠিক কী হবে?
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও পর্যন্ত বিস্তারিত কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, দিকনির্দেশনা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি।
যদি ইরান অত্যন্ত সততার সঙ্গে তাদের দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে এবং পারমাণবিক পরিদর্শকদের কাজে কোনো রূপ অসহযোগিতা না করে, তবে এই সাময়িক ছাড়পত্রের মেয়াদ ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বৃদ্ধি করা হতে পারে বলে অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রবল ধারণা করছেন।
অপরদিকে, চুক্তির কোনো শর্ত সামান্যতম লঙ্ঘিত হলে বিনা নোটিশে আবারও আগের চেয়েও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া নেমে আসার প্রবল আশঙ্কাও কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আপাতত সমগ্র বিশ্বের উৎকণ্ঠিত দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে আগামী দুই মাসের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল, জটিল ও চূড়ান্ত পরীক্ষামূলক সময়কালের দিকে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও জ্বালানি বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক বিরাট, ঐতিহাসিক ও ভূমিকা পালন করবে।