সোমবার, জুন ২২, ২০২৬
৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লেবাননে সামরিক হস্তক্ষেপের মার্কিন প্রস্তাব নাকচ করলেন আহমেদ আল-শারা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুন, ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

লেবাননে সামরিক হস্তক্ষেপের মার্কিন প্রস্তাব নাকচ করলেন আহমেদ আল-শারা
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেশী রাষ্ট্র লেবাননের চলমান সংকটজনক পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপের ইচ্ছা সিরিয়ার নেই বলে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি লেবানন ইস্যুতে সিরিয়াকে সামরিক ভূমিকা পালনের যে অভাবনীয় প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান এই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সিরিয়া তার প্রতিবেশী লেবাননের সঙ্গে কোনো প্রকার সংঘাতে জড়াতে বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে আগ্রহী নয়; বরং দামেস্ক বৈরুতের সঙ্গে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও একটি স্থিতিশীল কূটনৈতিক মেলবন্ধন তৈরি করার পক্ষপাতী।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই-ভিত্তিক জনপ্রিয় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম আল-মাশহাদকে দেওয়া এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা মধ্যপ্রাচ্যের এই স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজের সরকারের এই গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ নীতির কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করেন।

 

সিরিয়ার এই অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত ও উসকানিমূলক মন্তব্য। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই তার হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন।

 

তিনি বলেছিলেন যে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণভাবে দমন করতে ইসরায়েল কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে এবং তাদের এই ব্যর্থতায় তিনি চরমভাবে হতাশ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের এক বিতর্কিত সমাধান হিসেবে ট্রাম্প লেবানন ইস্যুটি সরাসরি সিরিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।

 

শুধু তাই নয়, ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এর শীর্ষ বৈঠকেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই একই সুর অনুরণিত করেন। বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে বলেন যে, ইসরায়েল যদি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে গিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ছাড়া অর্থাৎ সবাইকে হত্যা না করে সুনির্দিষ্টভাবে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সেই অসম্পূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করবেন।

 

মার্কিন প্রশাসনের এমন প্রকাশ্য উসকানির বিপরীতে সিরিয়ার নেতৃত্ব অত্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে সংঘাতে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন আগ্রাসী ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অবাস্তব বলে নাকচ করে দিয়েছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট।

 

তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, লেবাননের মাটিতে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধ করার একটি যৌক্তিক প্রস্তাব দিয়েছেন। সিরিয়ার মতে, লেবানন সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই; এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধান।

 

প্রেসিডেন্ট শারা জোর দিয়ে বলেন, সিরিয়া ও লেবাননের মধ্যে পূর্বের স্বাভাবিক সম্পর্ক এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংযোগ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করাটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি কাজ।

 

এর পাশাপাশি তিনি এমন একটি সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, যা শুধু সিরিয়া বা লেবাননের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগই প্রশমিত করবে না, বরং ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনায় নেবে।

 

তার মতে, একটি সমন্বিত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো ছাড়া এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অসম্ভব। লেবাননের বর্তমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটে গত ২ মার্চ।

 

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে হিজবুল্লাহ সেদিন ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়। এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী লেবাননের সীমানার ভেতরে ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা এবং পরবর্তীতে ভয়াবহ স্থল অভিযান শুরু করে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইসরায়েলের এই নির্বিচার ও আগ্রাসী হামলায় এখন পর্যন্ত লেবাননে চিকিৎসক, নিরপরাধ নারী ও শিশুসহ অন্তত চার হাজার সাতান্ন জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা চরম মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে।

 

তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্বাক্ষরিত একটি সাময়িক সমঝোতায় লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক চুক্তির ফলে গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে লেবাননের মাটিতে সামরিক সংঘাত আপাতত স্থগিত রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে শান্তির ক্ষীণ আশা জাগিয়েছে।

 

প্রতিবেশী রাষ্ট্র লেবাননের প্রতি সিরিয়ার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, লেবাননে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক প্রভাব রাখার বহু কার্যকর উপায় সিরিয়ার হাতে রয়েছে।

 

তবে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের যেকোনো উদ্যোগ সম্পূর্ণভাবে লেবাননের সরকার ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির ওপর নির্ভর করে। লেবাননের সার্বিক নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মূলত সিরিয়ার নিজের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

সংগত কারণেই প্রতিবেশী দেশটির অভ্যন্তরীণ যেকোনো রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে দামেস্ক গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই জটিল প্রেক্ষাপটে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সিরিয়ার আলোচনায় বসার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট শারা অত্যন্ত কূটনৈতিক প্রজ্ঞার সঙ্গে বলেন, যদি সেই আলোচনা লেবাননের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে এবং একই সঙ্গে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় স্বার্থকেও সুরক্ষিত করে, তবে সেই আলোচনায় বসতে কোনো বাধা নেই।

 

উল্লেখ্য, সিরিয়ার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে হিজবুল্লাহ সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারের পক্ষে অস্ত্র ধরেছিল। ফলে, আসাদের পতনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সিরীয় নেতৃত্বের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অবিশ্বাসে ভরপুর।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান পরিবর্তিত আঞ্চলিক রাজনীতিতে সিরিয়ার এই গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।

 

- এএফপি