দেশটির আইনসভা বা পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আন্তর্জাতিক আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি আর কোনোভাবেই তার অতীতের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে না।
বরং, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি পুরোপুরি অনুসরণ করে এই অত্যন্ত কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথটি এখন থেকে সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং একক নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হবে।
তার এই দ্ব্যর্থহীন ও জোরালো মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়ে থাকে।
সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনা শেষে গালিবাফ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের কাছে এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।
অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক এই আলোচনাটি সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান এবং কাতার।
বৈশ্বিক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ইরানের মধ্যকার এই সরাসরি এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈরিতা এবং প্রকাশ্য সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির অবসানে এই কূটনৈতিক বোঝাপড়া একটি গঠনমূলক ও ইতিবাচক সাময়িক যুদ্ধবিরতির পথের সূচনা করেছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
অত্যন্ত নিবিড় ও রুদ্ধদ্বার এই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে অবহিত করতে গিয়ে মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বিস্তারিতভাবে জানান যে, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক ইস্যুতে বৈঠকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননের বর্তমান রাজনৈতিক ও ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর দীর্ঘকাল ধরে আরোপিত কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বাস্তব সম্ভাবনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে আটকে থাকা বা জব্দ করা ইরানের বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও তহবিল শর্তসাপেক্ষে অবমুক্ত করার বিষয়টি।
কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চরম সংকটের মধ্যে থাকা ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবরুদ্ধ সম্পদের দ্রুত মুক্তি অত্যন্ত জরুরি, যা এই নিবিড় আলোচনার মাধ্যমে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যকার গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়ে অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন ইরানের এই প্রবীণ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রের প্রধান আলোচক।
তিনি অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে বলেন যে, যেকোনো সামরিক বা যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী এবং কার্যকর রূপ দিতে হলে কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। তার মতে, রণাঙ্গনে অর্জিত যেকোনো বিজয় বা সাফল্য যদি শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে রাজনৈতিক ও আইনগত স্বীকৃতি লাভ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সামরিক সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ সুফল কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র বা জাতি ভোগ করতে পারে না।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনা, সংলাপ এবং দরকষাকষিও মূলত এক প্রকার বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগ্রামেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সুতরাং, সামরিক পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কখনোই পরস্পরের বিরোধী হিসেবে মূল্যায়ন করার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই, বরং এগুলো একে অপরের শক্তিশালী পরিপূরক হিসেবেই কাজ করে।
সবশেষে, সুইজারল্যান্ডের এই বহুল আলোচিত শান্তি বৈঠক থেকে ইরান রাজনৈতিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যুগান্তকারী অর্জন নিশ্চিত করেছে বলে গালিবাফ দৃঢ়ভাবে দাবি করেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আশা প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে সম্পাদিত এই গঠনমূলক বোঝাপড়ার সুদূরপ্রসারী ও ইতিবাচক প্রভাব খুব শিগগিরই গোটা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি, সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোতে দৃশ্যমান হতে শুরু করবে।
পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরানের এই নতুন ও নমনীয় কূটনৈতিক সমীকরণ আগামী দিনগুলোতে ওই উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো মূল্যায়ন করছে।