এই অভাবনীয় সফলতার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইসলামাবাদ। বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাবশালীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে এমন গঠনমূলক ভূমিকা পালনের মাধ্যমে পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে নিজেদের কৌশলগত গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা আবারও অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক সাফল্যের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক নামের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তার দেশ প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
শাহবাজ শরিফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানরা অত্যন্ত আধুনিক প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রনিকভাবে এই চুক্তিতে নিজেদের স্বাক্ষর প্রদান করেছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই চুক্তির তাৎপর্য অপরিসীম।
এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি পুনরায় বিশ্ববাণিজ্যের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এবং একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কঠোর নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়েও চূড়ান্ত মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অত্যন্ত জটিল শান্তি উদ্যোগে নেপথ্য থেকে গঠনমূলক সহায়তার জন্য কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ভূরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই শান্তি উদ্যোগ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও প্রভাবশালী কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে সর্বমহলে বিবেচিত হতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যে তীব্র যুদ্ধাবস্থা ও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
কিন্তু এই অভাবনীয় সমঝোতার ঘোষণার পরপরই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে এবং বিশ্বের বড় বড় শেয়ারবাজারগুলোতে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে নতুন করে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের এই অসামান্য কূটনৈতিক সফলতা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের জন্য এক নতুন ও অত্যন্ত জটিল অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে সম্পূর্ণ একঘরে বা বিচ্ছিন্ন করে রাখার যে আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করে আসছিল, বর্তমান পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা আর কোনোভাবেই সহজসাধ্য নয় বলে মনে করা হচ্ছে।
বরং আঞ্চলিক সংকটে সমাধানের পথপ্রদর্শক হিসেবে পাকিস্তানের এই উত্থান ভারতের সেই সুদীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।
কূটনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের এই ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত ও কাঠামোগত কারণ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। প্রথমত, প্রায় চব্বিশ কোটির বেশি বিশাল জনসংখ্যা নিয়ে পাকিস্তান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি মুসলিম রাষ্ট্র।
সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির গভীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব পাকিস্তানকে একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করে দিয়েছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী পাকিস্তানি নাগরিক ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও সুদৃঢ় করেছে।
সামরিক সক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শনের দিক থেকেও বৈশ্বিক পরিসরে পাকিস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী একটি অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল স্থায়ী সেনাবাহিনী রয়েছে দেশটির।
শুধু তাই নয়, ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দেশটি নিজেদের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা শিল্পও সফলভাবে গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে তারা নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য ভারী সামরিক সরঞ্জাম ব্যাপকভাবে রপ্তানি করছে।
এর পাশাপাশি, একটি স্বীকৃত পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তানের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির সামরিক ভাণ্ডারে বর্তমানে প্রায় একশ সত্তরের বেশি সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেড মজুত রয়েছে।
একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে নিবিড় সামরিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রভাবকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক বিবেচনা করলেও পাকিস্তান ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত সুবিধাজনক একটি স্থানে রয়েছে। একদিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, কৌশলগত মিত্র চীন এবং তেলসমৃদ্ধ ইরানের সঙ্গে দেশটির সরাসরি দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে।
পাশাপাশি আরব সাগরের তীরবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান দেশটিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কাছে নৌবাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অপরিহার্য করে তুলেছে।
বিশেষ করে, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে পরিচিত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয় পাকিস্তান।
তবে এতসব সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তির পাশাপাশি দেশটিকে অভ্যন্তরীণ পরিসরে নানা ধরনের জটিল চ্যালেঞ্জ ও গভীর সংকটেরও প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বেলুচিস্তানসহ দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে চলমান সশস্ত্র বিদ্রোহ, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এবং ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশটির সার্বভৌমত্ব ও কূটনৈতিক স্বাধীনতায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দেশটির অন্যতম প্রধান দুর্বল দিক হিসেবেই বিবেচিত হয়।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ নানাবিধ চরম দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও একটি অত্যন্ত বাস্তববাদী, সময়োপযোগী এবং সুনির্দিষ্ট স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের মাধ্যমে পাকিস্তান অত্যন্ত সফলভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অপরিহার্যতা ও গুরুত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনে সদ্য সমাপ্ত এই ঐতিহাসিক সমঝোতা প্রক্রিয়ায় সফল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন মূলত তাদের সেই সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক কৌশলেরই একটি অত্যন্ত সফল ও বাস্তবসম্মত প্রতিফলন।
ফলস্বরূপ, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান জটিল ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা বা বিশ্বমঞ্চ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও প্রায় অসম্ভব একটি বিষয় হয়ে উঠেছে বলে দৃঢ়ভাবে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।